ইকোরান ২০১৩ এ মার্কাস এর সাফল্য

ইকোরান হচ্ছে স্বল্প-মূল্যে জ্বালানী সাশ্রয়ী যানবাহন তৈরির একটি প্রতিযোগিতা যেখানে প্রতি লিটার জ্বালানীর জন্য কতটা দূরত্ব অতিক্রম করা হয়েছে তা পরিমাপ করা হয়। ইকোরান প্রতিযোগিতা একটি জাপানী ঐতিহ্য হিসেবে জাপানসহ অনেক দেশে প্রতিবছর পালন করা হয়। বাংলাদেশে এবারেই প্রথমবারের মতো এটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। পরিবেশ-বান্ধব গাড়ি তৈরির এই প্রতিযোগিতার প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিল JICA এবং বুয়েট যন্ত্রকৌশল বিভাগ। এই বছরের ১৫ই মার্চ ঢাকার ‘বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে’ অনুষ্ঠিত হয় প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব। প্রকৃতপক্ষে ৩ চাকার গাড়ি বানানোর জন্যে এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হলেও পরবর্তীতে ৪ চাকার গাড়িও প্রতিযোগিতার অন্তর্ভুক্ত হয়। ৩ চাকা বা থ্রি-হুইলার বিভাগে বুয়েটের ‘মারকাস’ শীর্ষ স্থান অর্জন করে।

মার্কাসের নতুনত্ব

৩ চাকার সচারচর গাড়ির চেয়ে মার্কাসে বেশ কিছু নতুন ধরণের প্রকৌশল ধারণার প্রয়োগ করা হয়েছে, যেগুলো ব্যাবহারের উদ্দেশ্য আর পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে পরিবর্তন করা সম্ভব।

গতানুগতিক ধারার বাইরে মার্কাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য যেটি, এটির সামনে ২ চাকা এবং পিছনে ১ টি। সম্পূর্ণ নতুন একটি স্টিয়ারিং সিস্টেম আবিষ্কার করে এর কার্যকারিতায় দেয়া হয়েছে নতুন মাত্রা। চালকের হাতের নাগালেই ক্লাচ এবং গিয়ার শিফটিং থাকবার ফলে মার্কাসে রয়েছে অসাধারণ নিয়ন্ত্রণ সুবিধা।

মার্কাসের জ্বালানী সাশ্রয়ীতা, হালকা ওজন, সহজ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, বাহ্যিক সৌন্দর্য, পরিবেশ-বান্ধবতা এবং সর্বোপরি স্বল্প মূল্যের কারণে  এটি মোটরসাইকেল এবং এমনকি মাঝারী যানবাহনের বিকল্প হতে পারে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমান ডিজাইনের সামান্য কিছু পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করে এটিকে একটি যুগোপযোগী বাহন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

উৎপাদন প্রক্রিয়া

মার্কাসের উৎপাদন প্রক্রিয়ার দুইটি প্রধান ভাগে বিভক্ত ছিল: ডিজাইনিং এবং প্রয়োগ।

মূলত সমস্ত ডিজাইনিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছিল CAD সফটওয়্যারের মাধ্যমে। এক্ষেত্রে Solidworks এবং CATIA ব্যাবহার করা হয়েছে। গাড়ির প্রতিটা কাঠামোর জন্য অসংখ্য হিসাব-নিকাশ এবং পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রতি পদক্ষেপে নিরাপত্তা এবং অন্যান্য লক্ষ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

ডিজাইনিং শেষ হবার পর স্থানীয় বাজার থেকে সংগ্রহ করা উপাদানের গ্রহণযোগ্যতা বিভিন্ন ল্যাবে পরীক্ষা করে কাঠামো তৈরির কাজ শুরু হয়। মার্কাসের মেইন ফ্রেম বানানো হয়েছে খুবই হালকা SS Steel এবং Alluminium এর ফাঁপা কাঠামো ব্যবহার করে।

প্রতিযোগিতার পূর্ব প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী Walton এর 100 CC ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে মার্কাসে। সরবরাহ করা ইঞ্জিনটি ছিল Single cylinder air cooled ঘরানার যেটিতে সেলফ ইগনিশন সিস্টেম যুক্ত ছিল।

গাড়ির বাহ্যিক কাঠামো বানানো হয়েছিল Rexin এবং SS ফাঁপা পাইপের মাধ্যমে। এবং মোটরসাইকেলের যান্ত্রিক RIM ব্রেকের পরিবর্তে বাই-সাইকেলের Virtual ব্রেকের মাধ্যমে মার্কাসের ব্রেকিং সিস্টেম প্রস্তুত করা হয়েছিল।

খরচ

পুনঃ পুনঃ এক্সপেরিমেন্ট করবার পর মার্কাসের সার্বিক খরচ দাঁড়ায় ৪৩ হাজার টাকা। মার্কাস সংশ্লিষ্টগন মনে করেন যদি এটি বহু মাত্রায় উৎপাদন করা হয় সেক্ষেত্রে মার্কাসের বাজার দর ৫০ হাজার টাকার মাঝেই সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব!

যোগাযোগ

বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে মার্কাসের ফেব্রিকেশনের সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এ ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্যের জন্য উক্ত বিভাগীয় প্রধাণের কার্যালয়ে যোগাযোগ করা যেতে পারে।

পিছনের গল্প

ইকোরান নিয়ে অটোমেক দলের এই সমস্ত প্রক্রিয়াটা ছিল তাদের জন্য একটা এডভেঞ্চারের মতোই। ঘটনাবহুল এই প্রতিযোগিতায় অসংখ্য সফলতা-ব্যর্থতার পরেই অটোমেক তাদের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পেয়েছে।

বাংলাদেশ এই ইকোরান প্রতিযোগিতায় বহির্বিশ্বের সাথে সামিল হতে পারবে যদি একটি নির্দিষ্ট সফলতা (৮০০ কি.মি./ লিটার) অর্জন করতে পারে। নতুন কিছু করতে পারার আনন্দের মাঝে দলের সদস্যরা অনেক আশাবাদী হয়তো একদিন ইকোরানের মধ্য দিয়ে তারা বাংলাদেশের পতাকা বিশ্ব দরবারে তুলে ধরবার সুযোগ পাবেন।

দলের সদস্যগণ

ইমতিয়াজ আহমেদ
তানভীর আরাফাত ধ্রুব
সৈয়দ হাসান আল রাযী
মাজেদুর রহমান মাসুম
জামিউল আখতার হিমেল
রাজেশ সরকার
মোঃ হাসানুজ্জামান
প্রিন্স হোসাইন
শ্রীদেব দাস

তত্ত্বাবধায়ক

ড. মোঃ জাকির হোসাইন,
সহকারী অধ্যাপক, যন্ত্রকৌশল বিভাগ, বুয়েট।

Share Button

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*