নাসা লুনাবোটিক্স ২০১৩ এ বুয়েটের রোবট!

কার্ল সাগানের সেই ‘বিবর্ণ নীল বিন্দু: মহাশূন্যে মানুষের দেখা’ বইটা পড়েছেন কি? সেই যে মানুষ নানান গ্রহে ইচ্ছামতো যখন তখন ঘুরে বেড়িয়ে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসতো! বাচ্চাদের সাথে গল্প করত মহাকাশের, তার অসীমতার। কিংবা হার্জের ওই অসামান্য ‘চন্দ্রালোকে টিনটিন’ আপনার পড়া? অথবা সেই ছোট্ট বেলায় স্কুলে পড়া নীলের চন্দ্র অভিযান? এগুলো আসলে মনে না করতে চাইলেও মনে এসে যায়! রাত নামলেই আকাশের পানে চেয়ে সব ভুলে মায়ের গাওয়া ঘুমপাড়ানি চাঁদ মামার গান মনকে টোকা দিয়ে যাবেই, নস্টালজিক ভ্রমেরা কোথায় যেন শিহরিত করবেই মনকে।

জুলস ভার্ন, আইজাক আসিমভ, স্টিফেন হকিন্স সহ আরো কত শত স্বপ্ন-পুরুষেরা যে স্বপ্ন দেখেছেন ওই এক শুধু চাঁদ নিয়ে! আমাদের কবিগুরু নিজে মেতেছেন চাঁদের প্রেম-কাব্যে, একবার নয়, অসংখ্যবার। তাদের এই ভাবনার চেতন ঘিরে ছোটাছুটি করেছে আর করছে আরো কত সহস্র বিজ্ঞানী এবং প্রকৌশলী। কেন? শুধু কি স্বপ্নের আবেশেই তাদের এই উদ্যম, এত পথচলা?

‘নাসা লুনাবটিক্স মাইনিং কম্পিটিশন’ কি?

বাস্তবতা বলে মানুষ আসলে চাই সম্পদ! নতুন সব ঘেঁটে বের করতে চাই নতুন কোন সম্ভাবনা, নতুন কোন উপায় জীবনকে আরো সহজ আরো উপযোগী করবার জন্য। ঠিক এই কারণেই সারা বিশ্বে চলমান নানা মহাকাশ বিষয়ক প্রযুক্তিগত উদ্যোগের জন্য আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ‘নাসা’ সবার পরিচিত। তাদের চন্দ্র অভিযানের একটি অনুপ্রেরণাদায়ক কার্যক্রম ‘লুনাবটিক্স।’ পুরো নাম ‘নাসা লুনাবটিক্স মাইনিং কম্পিটিশন।’ ২০১৩ সালে নাসার এ প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশে থেকে ৫টি বিশ্ববিদ্যালয় অংশ নেয়। এ বছরের ২০-২৪ মে বুয়েট থেকে ‘মেকাট্রন’ যুক্তরাষ্টের ফ্লোরিডাতে কেনেডি-স্পেস সেন্টারে আয়োজিত লুনাবটিক্সে অংশ নিয়েছিল। এই প্রতিযোগিতার লক্ষ্য হচ্ছে ‘এমন একটি স্বয়ংক্রিয় রোবট বানানো যেটি গ্রহান্তরে বিভিন্ন ভূ-তাত্ত্বিক উপাদান সংগ্রহ করতে পারবে।’ বুয়েট এই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই তাদের অটো-বট তৈরি করে। বাংলাদেশ থেকে মেকাট্রন অতি স্বল্প সময়ে একটি যোগ্য রোবট হিসেবে নিজেকে মূল্যায়িত করে। ১ম রাউন্ডে ১০.৪ কেজি লুনার রেগোলিথ ( নুড়ি-পাথর বা চন্দ্র-ধূলি ) সংগ্রহ করে বুয়েট। প্রথম দিনে সেরা দশ-এ জায়গা করে রোবটটি। ২৫ মে স্থানীয় সন্ধ্যার সময় প্রতিযোগিতার ফলপ্রকাশ হয়। প্রথমবার অংশগ্রহণ করেই বুয়েটের লুনাবটিক টিম ‘লুনা ওয়ার্ল্ড ওয়াইড অ্যাওয়ার্ড’ বিভাগে তৃতীয় স্থান অর্জন করে। আর চূড়ান্ত পর্যায়ে ৫০ টি দেশের মধ্যে হয় ৭ম। বাংলাদেশের এমআইএসটি এর দলও বাংলাদেশকে গর্বের অংশীদার করে এবারের পর্বে।

লুনাবট যেভাবে কাজ করে

লুনাবট কি? এক কথায় বলা যেতে পারে, এটি একটি ‘বাহন।’ এই প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে লুনাবটের উদ্দেশ্য থাকে চাঁদের মাটি (লুনার ) একটি স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের মাধ্যমে সংগ্রহ করা। ওই যন্ত্রটিই লুনাবট। আপাত দৃষ্টিতে লুনাবট জিনিসটা খুব সহজ মনে হলেও সামগ্রিক রোবট তৈরির ব্যাপারটা অনেক জটিল এবং মজার। ইলেক্ট্রনিক্স আর যন্ত্রের কৌশলী পাঁচমিশালীতে একটা লুনাবট ধীরেধীরে সার্থক রূপ নিতে থাকে। প্রতিযোগিতার নানান নিয়ম-কানুন আর চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে একটা লুনাবটকে কম্পিটিশনে টিকে থাকতে হয়। নীচের ভিডিওটা দেখে বুয়েটের ‘মেকাট্রন’ লুনাবট সম্পর্কে একটা ভালো ধারণা পাওয়া যেতে পারে:

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে লুনাবট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ একটা ধারণা

কেবলমাত্র একটি ক্যামেরা আর তার সাথে অডিও-ভিডিও ট্রান্সমিটিং মডিউল সংযুক্ত করেই একে সেনাবাহিনীর গুপ্তচর হিসেবে সহজেই ব্যাবহার করা যেতে পারে। কৃষি-প্রধান আমাদের দেশে মাঠে ফসলের বীজ বপন, কীটনাশক দিতে ও মাড়াইয়ের কাজে মেকাট্রন ব্যাবহার করে অসাধারণ ইতিবাচক অর্থনৈতিক পরিবর্তন আনা সম্ভব। মেকাট্রনে ব্যাবহার করা হয়েছে কনভেয়র বেল্ট, ঠিক একারণে একে আধুনিক সুপার শপ গুলো থেকে এমনকি কর্দমাক্ত পথেও হালকা পণ্য ব্যাবহারে উপযোগী করে গড়ে তোলা সম্ভব। ভবন ধ্বস কিংবা অগ্নিকান্ড পরবর্তী উদ্ধার কার্যক্রমে এটির ব্যাবহার অনেক উদ্ধার-কর্মীর জীবনের ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে। দরকার শুধু একে নিয়ে এগিয়ে যাবার অনুপ্রেরণা আর প্রয়োজনীয় সাহায্য।

পিছনের গল্প

“বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেক্ট্রনিক কৌশল এবং যন্ত্রকৌশল বিভাগের চার তরুণ উদ্যমী বিভাগীয় উপদেষ্টার অধীনে ২০ জন সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত হয় ‘বুয়েট লুনাবটিক্স’ দল। এরপর বিভিন্ন ছোট ছোট দলে কাজ ভাগ করে এগিয়ে চলে মেকাট্রনের কাজ। অসংখ্য বাঁধা-বিঘ্নের মাঝ দিয়ে এগিয়ে চলে স্বপ্নের পথ চলা।”- বলেন দলের একজন। প্রথমবারের চেষ্টাতেই সফল হয়ে সকলের মাঝে এখন আরো অনেক কিছু করার আশা, সকল বাঁধা পেরিয়ে বাংলাদেশের পতাকা তুলে ধরবার পরবর্তী সুযোগের অপেক্ষায় আছেন বুয়েট লুনাবটিক দল। বাংলাদেশের হয়ে তাদের তৈরি রোবট দিয়ে তাক লাগিয়ে দিতে চান বিশ্ববাসীকে।

বুয়েট মেকাট্রনের সদস্যগণ

এম এ আওয়াল

মোঃ আজিমুর রহমান অঞ্জন

পারভেজ আহমেদ

রিজওয়ান আহমেদ

ইকরাম শিমুল

খন্দকার সামিউজ্জামান

জাবির আহমেদ

এস এম শায়খ ইবনে ফারুকী

মোঃ ইশফাক জাহান রাফী

নাবিদ মোস্তফা জিসান

মোঃ নাসিম ইমতিয়াজ খান

জুবায়ের ইবনে রব্বানী

কে এম মফিজুর রহমান

মোঃ তানভীর আলম আরমান

আদিব নাহিয়ান

সৌমিক ইসলাম

মোঃ এহসানুল হক

মোঃ শাহ জামান

মোঃ শাফায়াত হোসেন

আরিয়ান এম কবির

ফ্যাকাল্টি, বুয়েট মেকাট্রন

উপল মাহবুব

কে এম রাফিদ হাসান

সাজিদ মুহায়মিন চৌধুরী

আরিফ আব্দুল্লাহ রোকোনী

লুনাবটের আনুমানিক ব্যয়

দ্রব্য খরচ (টাকা)
Main  frame  3500
Wheel  7375
Motor accessories  6300
Excavation subsystem  6200
Dumping subsystem  8055
Electrical & computer system  48680
Total  80,110

Share Button

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*