IRC-২০১৪ সাফল্য: যন্ত্র-মানুষের চাওয়া-পাওয়া !

ছবিতে বাঁ থেকে- অনিক, শুভ, তানভীর, আমি আর ইমাম।

ইউনিভার্সিটি নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন ছিল… অনেক । ইলেক্ট্রনিক্স, প্রোগ্রামিং অনেক ভাল লাগত – ভাবতাম ইঞ্জিনিয়ারিং যদি পড়িই – এই দুটোতে বা মেকানিক্যালে পড়ব (তবে সবথেকে বেশী চাইতাম ফিজিক্সে পড়ার যদিও এখন বুঝি ওটার জন্য দরকারী এত ভাল ম্যাথ আমি জীবনেও পারতাম না ) এই তিনটা বিষয়কে একসাথে করলে আসলে মানুষের সৃষ্টির আর কোন সীমা থাকে না । কিন্তু আমি সেই চান্স পাই নাই । বুয়েটে সিরিয়াল ছিল পিছনের দিকে । EEE/CSE/ME ভাগ্যে জোটে নাই । তবুও “বুয়েট” সীলটার লোভে পড়ে লাইফের সব প্ল্যান চেঞ্জ করে এখানেই ভর্তি হলাম নেভাল আর্কিটেকচারে ।

ক্লাস শুরু হওয়ার পর থেকে একটা বছর আমি শুধু হতাশ হয়ে পড়ে ছিলাম । ছোট থেকে স্বপ্নের “বিশ্ববিদ্যালয়” এর সাথে বাস্তবটাকে মিলিয়ে হতাশ হয়ে বসে থাকতাম … আমি যে লাইফটা চাইতাম সেটা পেতাম না । প্রোজেক্ট , কম্পিটিশনের কোন খবরই পেতাম না । শুধু কম্পিউটার আর ইলেক্ট্রিকালেই মনে হয় এসবের একটু ট্রেন্ড আছে এখন । মেকানিক্যালে আগে ছিল, এখন খুব কম ।

এই সময় মাঝে মাঝে আমি ভাবতাম- এখানে থেকেই আমি আমার পছন্দের সব কাজ করে ফেলব । EEE , CSE এর ছেলেপেলে আমাকে হিংসা করবে । কিন্তু নিজের মত করে আগাতে পারছিলাম না । দুই দিন স্পিরিট থাকে, ৩ দিন থাকে না । খুবই আগোছালো ভাবে হচ্ছিল সবকিছু।

একসময় বুঝতে পারলাম একাডেমিকালি ওদের সমান আমি কখনই হতে পারব না । ওরা এদেশের বেস্ট ভার্সিটিটার টিচারের কাছে পড়ছে, ল্যাব করছে । একটা স্ট্র্যাকচারড ওয়েতে ৪ টা বছর তারা সবকিছু পড়তে থাকবে, সব জানবে । আমার এই “শখের” , ইন্টারনেট ভিত্তিক পড়াশুনা আর ওদেরটায় আসলে আকাশ- পাতাল তফাৎ ।

হুহ…
ক্লাসের রেজাল্ট ছিল প্রায় সবথেকে খারাপ , অন্য দিকেও পুরো শুণ্য ।

এ সময় আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছেন মেকানিক্যালের শোভন ভাইয়া । নটরডেমে থাকতে একটা সাইন্স ফেয়ারে প্রাইজ পেয়ে আমি তার সুনজরে পড়েছিলাম । তাকে আমি আমার গুরু মানি । থ্যাঙ্কস ভাইয়া ।

এরকম সময়ে তানভির আহমেদের এর সাথে আমার পরিচয় হয় । বুয়েটের ইলেক্ট্রনিক্সের ছাত্র । সেও চাইত অনেক কিছু করতে । স্পেশালি রোবটিক্সে । অনেক কথা হল, গল্প হল । কিন্তু কাজের কাজ আসলে কিছুই হয়নাই ।

কদিন পর বুয়েটের ইলেক্ট্রিক্যাল ডিপার্টেন্টে একটা লাইন ফলোয়িং রোবটের কন্টেস্ট হয় । ওখানে তানভিরের দল অংশ নেয় এবং থার্ড হয় । তানভিরের মাধ্যমে ওর ওই টীমের দুই গ্রুপমেট ইমাম আর ফয়সাল এর সাথে পরিচয় হয় । জানলাম সামনে একটা কন্টেস্ট আছে- রুয়েটে । নাম “মাইক্রোমাউস”।বাইরের দেশে অনেক আগে থেকে হয় । কিন্তু বাংলাদেশে ওটাই ছিল প্রথম ।

তানভির, অনিক ইমাম আর হাকিম ওই কন্টেস্টের জন্য কাজ শুরু করার চিন্তা ভাবনা করছিল । ওদের সাথে দল বেঁধে আমিও কাজ শুরু করি । টিম রেজিস্ট্রেশনের শেষদিন এক বৃষ্টিভেজা বিকালে টিমের নাম খুজছিলাম আমি আর তানভীর । শেষ পর্যন্ত নাম দেই – “ErfindeR” । জার্মান একটা শব্দ । মানে উদ্ভাবক । এরফাইন্ডারের ব্যানারে আমরা আমাদের ফার্স্ট কন্টেস্টে যাই রুয়েটে ।

চ্যাম্পিয়ন হই ।

আবার আস্তে আস্তে মনের জোর ফিরে পাচ্ছিলাম । সে বছরই হয় প্রথম IRC (ইন্টারন্যাশনাল রোবটিক্স  চ্যালেঞ্জ) এবারের ভেন্যু বুয়েট । হাকিম দল ছেড়ে দেয় । নতুন আসে অনিক । অনেক বড় একটা ইভেন্ট তাই অনেক আশা নিয়ে কাজ করে যাই । কিন্তু দুরদর্শিতার অভাবে আর কাজ শেষ করতে পারি না । তবুও থার্ড হই । প্রথম দুটো টিম যায় ভারতে ইন্টারন্যাশনাল রাউন্ডে ।

অনেক কষ্ট করেছিলাম, টাকা ঢেলেছিলাম এই কন্টেস্টের জন্য । তাই ইন্ডিয়া যেতে না পেরে আমরা বিশাল ধাক্কা খাই ।

এই সময়ে আবার আমার কিছু ব্যাক্তিগত সমস্য তৈরী হয় এবং রেজাল্টও অনেক খারাপ করি । আবার সবকিছু ছেড়েছুড়ে দেই । এর কয়দিন পর হয় GRC: গ্লোবাল রোবটিক্স চ্যালেঞ্জ । বাংলাদেশ রাউন্ডে ফার্স্ট হলে ইন্ডিয়া । দলের বাকি তিনজনই মূলত সব কাজ করে ফেলে । কন্টেস্টের দিন প্রথম রাউন্ডে বিশাল ব্যাবধানে আমরা ফার্স্ট হই প্রায় ২৬ টা টিমের মধ্যে । কিন্তু সেকেন্ড রাউন্ডে গিয়ে আমাদের রোবটের সেন্সরের তার খুলে গিয়েছিল । ব্যাপারটা বুঝতে আমাদের সময় লাগে । পরে অনেক করে বলেও আমরা একটা এক্সট্রা রিস্টার্ট দিতে পারিনি । জাজরা রাজি হয়নি ।

এবার আমার কষ্ট ছিল কম । কিন্তু তানভীর আর অনিক একদম ভেঙ্গে যায় । আর ইমাম তো সবসময়ই ধীর স্থির মানুষ । কোন কিছুই তাকে হতাশ করতে পারে না …

পরে অবশ্য জাজরা আমাদেরকে একটা অনারেবল মেনশন দিয়েছিল ।

এরপর আমি আর ফোকাস করতে পারি না । বুঝতে পারি ইন্টারেস্ট সব উবে গেছে । ঠিক করি দল ছেড়ে দেব । তারপর অন্য কিছু করব- পেপার লিখব । কন্টেস্ট আর না । ওদিকে কিছুদিন পর বাকিরাও অন্য দিকে ইন্টারেস্টেড হয়ে যায় । রোবটিক্স আর না ।

তখনই খবর আসে এই বছরের IRC এর । ডিসিশন নেই এটাই হবে এরফাইন্ডারের শেষ রোবট কন্টেস্ট । এটা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আবার ঠিক করি রোবট নিয়ে একটা পেপারও আমরা লিখে ফেলব । আমি প্রায় এক দুই মাস ধরে একটা মডেল দাড় করাই । তারপর তানভির আর অনিকের সাথে এডিট করতে থাকি । আমদের প্রথম পেপার এক্সেপ্টেড হয় । যদি আর কাজ করা ছেড়ে দিতাম পেপারটা আসলে পাব্লিশ হত না- আমি জানি ।

আমাদের শেষ তাসটা ছিল IRC 2013-14 । আমরা সবাই খুব চাচ্ছিলাম শেষটা যেন খুব ভালমত হয়… চ্যাম্পিয়ন হয়ে শুরু করেছিলাম, চ্যাম্পিয়ন হয়েই যেন শেষ হয়!

আমাদের টার্গেট ছিল রিজিওনালে চ্যাম্পিয়ন হওয়া – কিন্তু তা হয়নি । ২ রাউন্ডে সিলেকশন হয়েছিল । প্রথম রাউন্ডে কোন একটা অজানা কারনে আমরা যাচ্ছেতাই রকমের খারাপ করি । তবে সেকেন্ড রাউন্ডে বিশাল ব্যাবধানে এগিয়ে থাকি – গড়ে খুব অল্প কিছু ব্যাবধানে আমরা সেকেন্ড হই । ফার্স্ট হয় আমাদের বন্ধুদেরই একটা দল – বুয়েট রেক্স । অসম্ভব সৃজনশীল এই দলটাকে আমরা সবসময়ই রেসপেক্ট করতাম । আর তাই ওদের সাথেই ইন্টারন্যাশনল রাউন্ডে যাচ্ছি- এতে আমরা অনেক খুশি হই।

এশিয়ার সবথেকে বড় টেকনোলজিকাল উৎসব – Techfest. ভারতের IIT BOMBAY তে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত এই উৎসবের একটা পার্ট হল- IRC তথা International Robotics Challenge. এবারে বাংলাদেশের বাছাইপর্বে দ্বিতীয় হবার বদৌলতে আমরা আমন্ত্রণ পাই ভারতে ফাইনাল রাউন্ডে প্রতিযোগিতা করার । যেখানে আমাদের প্রতিপক্ষে থাকবে ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, নেপাল, ফ্রান্স, সুইডেন, দক্ষিন আফ্রিকা, মিশর, রাশিয়া, ইথিওপিয়া ও থাইল্যান্ড থেকে আসা দল ।

এটা ছিল আমার জীবনে প্রথম বাংলাদেশের বাইরে যাওয়া … ভারতে ১১ দিন ছিলাম – ফিরে এসেছি অসাধারণ সব স্মৃতি নিয়ে, অভিজ্ঞতা নিয়ে। বাংলাদেশ থেকে আমরা ৪ টা দলে মোট ১৬ জন গিয়েছিলাম কন্টেস্টে । প্রথমে কোলকাতা , সেখান থেকে ৩১ ঘন্টা ট্রেনে করে মুম্বাই । সেখানে আমরা সব দল একসাথে হই ।

একসাথে অপুর্ব কয়েকটা দিন কাটিয়েছি ওখানে । ফারসিদ ভাই, টিপু ভাই, মহসিন ভাই, নাভিদ ভাই – যাদেরকে এতদিন আমি শুধু রোবটের এরেনায় দেখেছি- তাদের সাথে এবার দেখলাম অনেকগুলো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট … আমার দল এই প্রতিযোগিতায় তৃতীয় হয়েছে । প্লেসের ভিত্তিতে দেশের র‍্যাঙ্কিং করা হলে বাংলাদেশের অবস্থান ২য় । বাংলাদেশের ৪ টা দলই ছিল প্রথম ১০ এর মধ্যে ।

একটা জিনিস এখানে বলা উচিৎ – দেশের মধ্যে যখন কোন কন্টেস্ট হয় – নিজের ক্লাসের বাইরে কেউ কিন্তু বিজয়ীদেরকে চেনে না- চেনে তার ভার্সিটিকে । আমরা জিজ্ঞাসা করি- “এবার ACM এ কে ফার্স্ট হইছে রে?” উত্তর আসে- “শাহাজালাল” ।

স্টুডেন্ট এখানে খুব মাইনর । সে একটা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি । আন্তর্জাতিক কন্টেস্টেও সেরকম ব্যাক্তি, প্রতিষ্ঠান বলে কিছু নেই । মানুষ শুধু জানে শ্রীলঙ্কা ফার্স্ট হয়েছে, বাংলাদেশ থার্ড । আর এজন্যই মনে হয় আমরা ৪ টা দল আলাদা কিছু ছিলাম না।

ফারসিদ ভাইয়াদের রানে আমি তাদের দলের মেম্বার সেজে ভিডিও করতে উঠে যাই, আমরা ম্যাচে জিতলে সবার আগে স্টেজে উঠে জড়িয়ে ধরে জাহিন, আর ফাইনাল রানের ১০ মিনিট আগে অজানা কারনে নষ্ট হওয়া ব্যাটারি ফেলে দিয়ে ফারসিদ-টিপু-মহসিন ভাইয়ের রোবট থেকে ব্যাটারি খুলে সোলডার করে আমরা ঊঠে যাই রান দিতে । তারা না থাকলে ওই রান আমরা দিতেই পারতাম না । অর্থাৎ “বুয়েট-ক্রিপ্টোনাইট” না থাকলে “এরফাইন্ডার” দল কখনোই সেকেন্ড রানার আপ হতে পারত না … লিটারেলি।

আমার কাছে মনে হয় জীবনে মজাটাই সব । যেটা মজা লাগে না- যেটা ঝামেলা লাগে- সেটা কেন করব ?  সেই হিসেবে – আনন্দের খোরাক হিসেবে দেখলে এই ট্যুর এ প্লাস পাবে । এই ১১ দিনে একটু পরপরই যেভাবে অবাক হয়েছি, মুগ্ধ হয়েছি,নতুন কিছু দেখেছি, শিখেছি- সেটা জীবনে আগে কখনো হয় নাই । প্রকৃতি কতটা সুন্দর হতে পারে, মানুষের সৃষ্টি (রোবট কিংবা বিল্ডিং) কতটা অসাধারণ হতে পারে তা আবার নতুন করে মস্তিষ্কে স্কেলিং করতে হয়েছে!

আমাদের অর্জন খুব বেশী না । কিন্তু যেটুকুই অর্জন করেছি তা তখন বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ওই পুরো ১৬ জন মিলেই করেছি । আর এখন তাও না – এখন করেছি আমরা সবাই মিলে । র‍্যাঙ্কিংএ আমি নাই, র‍্যাঙ্কিংএ বুয়েট নাই । র‍্যাঙ্কিংএ বাংলাদেশ আছে… আর এর পেছনে আছে আমার একটুখানি অবদান!
আহ… এর থেকে সুন্দর অনুভূতি আর কি হতে পারে ???

Share Button

5 Comments

  1. পড়ে ভালো লাগল। আমাদের মত লো সিজি পাবলিকদের জন্য বিরাট অনুপ্রেরনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*