ক্যানভাস লাইভঃ ছবির মাধ্যমে অটিস্টিক শিশুদের শিক্ষা!

অটিজম একটি মানসিক বিকাশগত সমস্যা যা সাধারণত জন্মের পর প্রথম তিন বছরের মধ্যে হয়ে থাকে। এই সমস্যার জন্য সামাজিক বিকাশ ও সামাজিক যোগাযোগ বাধাপ্রাপ্ত হয়।

মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক বায়োলজি ও কেমিস্ট্রির দরুণ এ সমস্যা সৃষ্টি হয়ে থাকে। বিজ্ঞানীরা এখন পর্যন্ত এই সমস্যার সরাসরি কোন কারণ খুঁজে পাননি। সারা পৃথিবীতেই এটা নিয়ে নিরন্তর গবেষণা চলছে। অটিজমের কারণ হিসেবে জিন এর অস্বাভাবিক বৃদ্ধিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে চিহ্নিত করা হয় । আমেরিকাতে ষাটের দশকে প্রথম অটিস্টিক শিশুকে চিহ্নিত করা হয়। তবে তখন একে ‘ব্যাখ্যাতীত অক্ষমতা’ হিসেবে দেখানো হয়েছিল। ১৯৯১ সাল থেকে ‘Special Education Exceptionality’ হিসেবে অটিজমকে অন্যান্য শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতার বাইরে স্বতন্ত্র ক্যাটাগরি-ভুক্ত করা হয়। বর্তমানে এটি অন্যতম ‘Fastest-growing Developmental Disability’ যার বার্ষিক গড় বৃদ্ধির হার ১০-১৭% (অটিজম সোসাইটি অফ অ্যামেরিকা’র ২০০৬ সালের তথ্যানুযায়ী)।

অনেকেই এধরণের শিশুদেরকে সমাজের জন্য বোঝা হিসেবে মূল্যায়ন করেন, যা একটি ভুল ধারণা তো বটেই বরং এটা তাদেরকে চরম অপমানের সামিল।

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে অটিস্টিক শিশুরা তাদের চিন্তাভাবনার জন্য ভাষার চেয়ে ছবির সাহায্য বেশি নিয়ে থাকে। কল্পনায় তাদের এই ছবিগুলো একটার পর একটা নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকে। কিছু বুঝতে হলে শব্দভাণ্ডারের চেয়ে তাই এই ছবিই বরং তাদের বেশি সাহায্য করে। সেজন্য ছবির মাধ্যমে তাদেরকে শিক্ষাদান করাই সবচেয়ে ভাল উপায়।

এই চিন্তা থেকেই বুয়েট এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সদস্যদের সমন্বয়ে তিনজনের একটি দল গেলবারের ভারতের তামিল নাড়ুতে ‘কুমার-গুরু প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে’ অনুষ্ঠিত Asia 13: Code-A-Thon Challenge প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে অটিস্টিক শিশুদের জন্য একটি ‘শিখন যন্ত্র’ বা এপ্লিকেশনের উদ্ভাবন করে। এটির নাম তাঁরা দিয়েছেন ‘ক্যানভাস লাইভ’।

ক্যানভাস লাইভনামের পিছনে

মূলত অটিস্টিক শিশুদের জন্য একটা কার্যকর আর সহজে যোগাযোগের সমাধান বের করার তাগিদ থেকেই এই আইডিয়া পান দলের সদস্যগণ। আবার, তাদের উদ্দেশ্য ছিল সমাজকে এটাও জানানো যে অটিস্টিক শিশুরা চারিপাশের পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন তো নয়ই বরং সঠিক সুযোগের মাধ্যমে তারাও আর দশ জনের মতোই সম্ভাবনা নিয়ে আসতে পারে। এসব শিশুকে যথাযথ সুযোগ দিতেই এখানে পুরো ব্যাপারটা ছবির মাধ্যমেই করা হচ্ছে, ঠিক যেমনটি একজন শিল্পী তার ক্যানভাসে তুলির আঁচড়েই মনের কথা সবাইকে জানিয়ে দেন।

ক্যানভাস লাইভএর সহজবোধ্যতা

এই প্রোজেক্টে একটি ছবি আকার ভার্চুয়াল জায়গা থাকবে। কম্পিউটারের স্ক্রিনে কিংবা মোবাইল ফোনের পর্দায়। ছবি আঁকার জন্য যা যা সরঞ্জাম দরকার যেমন: পেন্সিল, তুলি, ইরেজার সবকিছুই সেখানে থাকবে। একজন অটিস্টিক শিশুর জন্য সেটার সাহায্যে ছবি আঁকায় কোনপ্রকার সীমাবদ্ধতা থাকবেনা। তারা তাদের পছন্দ, অপছন্দ, আগ্রহের সবকিছু নিয়ে সেখানে রঙের মাধুরী মিশিয়ে খেলা করবে।

তাদের এই আঁকা ছবিগুলো একটি ওয়েবসাইটে শেয়ার করা হবে যেন সবাই সেটি দেখতে পারে। যেন সবাই সেটি আঁকার জন্য তাদের প্রশংসা করতে পারে। এবং তাদের প্রশংসা-বানী পৌঁছে দেয়া হবে তাদের কাছে। সবার এই বাহবা তাকে পরবর্তীতে আরও এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করবে।

ওয়েবসাইটটি কেবল তাদের শেয়ারিং এর মাধ্যমই হবেনা বরং তাদের শিক্ষাদানেরও একটা উপায় হবে। সেখানে বিভিন্ন বিষয়ের উপর বিভিন্ন ছবি থাকবে। প্রকৃতি, গণিত, বিজ্ঞান, সামাজিক শিষ্টাচার- কোন কিছুই বাদ যাবেনা। একজন অটিস্টিক শিশু যখন কিছু শিখতে চাইবে তার সামনে এগুলো একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষকের ভূমিকা রাখবে।

শিক্ষাদানের যে নিয়মটা এখানে অনুসরণ করা হচ্ছে এটা আসলে মানুষের মনোবিজ্ঞান ভিত্তিক কিছু গবেষনায় পাওয়া ফলাফল। তারা যখন একটা ছবির অনুকরণ করতে চেষ্টা করবে, স্বভাবতই তখন তারা এই ছবির সাথে একাত্ম হয়ে যাবে, এবং সেই মুহূর্তে তার মাঝে এই ছবির জন্য একটা ধারণার শক্ত গোড়াপত্তন হয়ে যাবে। এটা খুবই স্বাভাবিক যে এর মাঝেই তারা তাদের কল্পনার সাথে মিলে যায় এমন কিছু টপিকের মিল পেয়ে যাবে, যেগুলো একইসাথে তাদের জন্য আনন্দের, এবং তার মাধ্যমেই তারা অন্যান্য স্বাভাবিক শিশুর সাথে মিশে যেতে পারবে।  আর এভাবেই চিন্তাধারণার আদান প্রদানের মাধ্যমেই তারা হয়ত শিখে চলবে অজানা কোন বিষয়।

এই প্রোজেক্টের প্রথমদিকে, তাদের জন্য ছবির সাহায্যে বেশকিছু খুব সাধারণ সমস্যা সমাধানেরও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছাড়াও তারা কিভাবে এটিকে গ্রহণ করছে তার পাশাপাশি তাদের মনের ভাব জানবার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এছাড়াও, ধাপে ধাপে একজন অটিস্টিক শিশুর বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশের জন্য উদ্ভাবকগণ বেশ কিছু মজার পাজল গেমের ব্যবস্থা রেখেছেন।

‘ক্যানভাস লাইভ’ এপ্লিকেশনটি পাওয়া যাবে http://gcdc2013-woodpencil.appspot.com/ ঠিকানায়। বর্তমানে এপ্লিকেশনটি ‘গুগল ডেভেলপার কন্টেস্টে’ অংশগ্রহণরত, আরও উন্নয়নের পর এটি সকলের পক্ষে বিনামূল্যে ব্যাবহারের জন্য উম্মুক্ত করা হবে। চলুন দেখে নিই এপ্লিকেশন দেখতে কেমন,

1

যেভাবে ধাপে ধাপে থাকবে ছবি-আঁকা পর্ব

2

শিক্ষাদানের প্রক্রিয়া

3

একটি পাজল গেইমের উদাহরণ

4

দলের সদস্যগণ

শেখ তানভীর আহমেদ, তড়িৎ ও ইলেক্ট্রনিক কৌশল, বুয়েট।

মোঃ আশরাফুজ্জামান, চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সৈয়দ ইমাম হাসান, তড়িৎ ও ইলেক্ট্রনিক কৌশল, বুয়েট।

Share Button

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*