অন্তুর ড্রোন

[ লেখক রাগিব হাসানের অনুমতিক্রমে প্রকাশিত। মুল লেখা এখানে ]

বাংলাদেশের প্রথম ড্রোনটি কবে তৈরী করা হয়েছিলো? না, এখন না, দুই বছর আগেও না, প্রথমদিককার একটি ড্রোন তথা দূরনিয়ন্ত্রিত উড়োযান তৈরী করা হয়েছিলো আজ থেকে ২২ বছর আগে সেই ১৯৯২ সালে!!

ড্রোন নিয়ে পড়তে পড়তে হঠাৎ স্মৃতির কোথাও মনে হলো, এরকম ড্রোনের কথা কোথায় যেন পড়েছিলাম বহু বহু আগে, যখন স্কুলে পড়তাম। ফেইসবুকের কল্যাণে খোজ খবর করতেই পুরোটা মনে পড়লো, আর বাংলাদেশের প্রথম সেই ড্রোনের অসাধারণ কাহিনীটা নানাজনের স্মৃতিচারণে এলো বেরিয়ে। এই কাহিনীটা এতো ইন্টারেস্টিং, সবার সাথে তাই শেয়ার করছি।

সময়টা ১৯৯২ সাল। বুয়েটের তড়িৎকৌশল বিভাগের ছাত্র ছিলেন মোঃ আসিফুর রহমান অন্তু ভাই। ইলেকট্রনিক্স তাঁর নেশা। অন্তু ভাইয়ের মাথায় হঠাৎ ভুত চাপলো, ড্রোন প্লেন বানাবেন। তখন ইন্টারনেট নাই, কিছু জানতে হলে লাইব্রেরিতে গিয়ে এবই, সেবই ঘেঁটে ঘেঁটে হয় বেড়াতে। কিন্তু কীভাবে? প্লেন ডিজাইন করতে পারেন এমন কেউ তো নাই আসে পাশে। অন্তু থামলেন না, ব্রিটিশ কাউন্সিলের সংগ্রহে থাকা পপুলার মেকানিক্স ম্যাগাজিনে পেলেন একটা সার্কিট প্লেনের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করার। যোগ করলেন নিজের ডিজাইন করা একটা সার্কিট এর সাথে। বুয়েটের ল্যাব থেকে কিছু কেমিকাল ধার করে নিজেই বানিয়ে নিলেন সেই সার্কিট বোর্ড।

এবার আসল প্লেনটা বানাবার পালা। ডিজাইন আছে। কিন্তু প্লেনের বডি বানাবার জন্য লাগবে দুষ্প্রাপ্য সব উপকরণ। কিন্তু অন্তু ভাইকে দমিয়ে রাখা গেলোনা। বরিশালের দেশলাই ফ্যাক্টরি থেকে জোগাড় করলেন ম্যাচবক্সে ব্যবহৃত হালকা ওজনের কাঠ, যা দিয়ে বানানো হলো প্লেনের বডির কিছু অংশ। ধাতব অংশের জন্য দরকার ছিলো এলুমিনিয়াম, তা পেলেন তেজগাঁর পুরানো এয়ারপোর্টের ময়লার স্তুপে, একজন সুইপারকে দিয়ে যোগাড় করা সেই এলুমিনিয়ামের টুকরা ধোলাইখালে গলিয়ে বানানো হলো প্লেনের বডি। ইঞ্জিনের গিয়ার বানালেন পাটুয়াটুলির ঘড়ির দোকানে পাওয়া প্লাস্টিক গিয়ার দিয়ে। আর রাইফেলের গুলির খোসা একটা জোগাড় করে নিয়ে সেটা দিয়ে বানালেন ইঞ্জিনের পিস্টন। নানা কেমিকাল মিশিয়ে নিজেই তৈরী করে ফেললেন প্লেনের ইঞ্জিনের ফুয়েল। আর সবাইকে অবাক করে সেই প্লেনটা দিব্যি উড়ে গেলো আকাশে, অন্তু ভাইয়ের স্বপ্নকে সাথে করে।

এভাবে বাস্তবে রূপ নিলো সম্পূর্ণ স্থানীয়ভাবে তৈরী করা অন্তুর স্বপ্নের সেই ড্রোন উড়োযান।

অন্তু ভাইয়ের সেই ড্রোনের পরিণতি কী হয়েছিলো? পরীক্ষামূলক ফ্লাইট শেষে একবার ১৯৯২ সালে বুয়েটের মাঠে এক অনুষ্ঠানে ওড়ানো হয়েছিলো এই প্লেনটাকে। কিন্তু বিধি বাম – উড়তে উড়তে হঠাৎ প্লেনটা চলে গেলো রিমোট কন্ট্রোলের সীমার বাইরে। ফলে আর সেটাকে নিয়ন্ত্রণ করা গেলোনা, সবার চোখের সামনে উড়তে উড়তে গেলো হারিয়ে। আর এভাবেই শুরু কিংবা শেষ হলো বাংলাদেশের প্রথম সেই ড্রোনটার গল্প।

বর্তমানে কোয়াড কপ্টার বা ফিক্সড উইং ড্রোন বানানোর সব টিমকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। আর সেই সাথে সবাইকে মনে করিয়ে দিতে চাই, ইচ্ছা আর অদম্য কৌতুহল থাকলে দেশে বসেই সম্পূর্ণ স্থানীয় ভাবে যে কেউ বানাতে পারেন স্বপ্নের জিনিষটা। স্বপ্নের শক্তি এখানেই।

———–
বুয়েটেক ফুটনোটঃ
– মডেল প্লেন বানানোর জন্য সাধারনত ‘বালসা’ নামের এক ধরনের খুব হাল্কা কাঠ ব্যাবহার করা হয়। বাংলাদেশে দেশলাইর বাক্স আর কাঠি বানানো হয় ছাতিম গাছের কাঠ দিয়ে, যা বালসার চাইতে ভারী, কিন্তু আসিফুর রহমানের ঐ মুহূর্তে এর চাইতে ভাল আর কিছু পাওয়া সম্ভব ছিল না।
– সার্কিট বোর্ড বানানো হয়েছিল পিসিবি কে ফেরিক ক্লোরাইড দিয়ে দাগ কেটে। [ আরও তথ্য ]
– এই প্লেনে হাতে বানানো ইঞ্জিন ব্যাবহার করা হয়েছিল বর্তমানের ব্যাটারি আর ইলেক্ট্রিক মোটরের বদলে। ১৯৯২ সালে ব্যাটারি প্রযুক্তি এখনকার মত এত উন্নত ছিল না (এমনকি এখনকার সবচাইতে ভাল লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি দিয়েও ১৫-২০ মিনিটের বেশি উড়ানো কঠিন)। সেই ইঞ্জিন চলত ৯০% মিথাইল অ্যালকোহল ও আর কিছু রাসায়নিক দিয়ে তৈরি জ্বালানীতে।
– পুরনো ফ্যাক্টরির মেশিন থেকে নেয়া জাইরো [ আরও তথ্য ] দিয়ে এর আনুভুমিক আর উলম্ব ডানার [ আরও তথ্য ] ওঠানামা আর কাপুনি [ yaw and roll-আরও তথ্য ] নিয়ন্ত্রন করা হয়েছিল।
– বানাতে মোট খরচ পড়েছিল ৳২,২০০ (১৯৯২ সালে, এখন যা ২০১৪তে ৳৯,৭৪০ এর সমান)
– তখন ছাত্র অন্তু এই টাকা জমিয়েছিলেন ছাত্র পড়িয়ে, টিভি আর ভিসিআর ঠিক করে, নিজের বানানো ডিশ অ্যান্টেনা আর টিউব লাইটের ব্যালাস্ট বিক্রি করে।

Share Button

7 Comments

  1. undoubtedly Antu vai was a warrior, a real one! when i see “তখন ছাত্র অন্তু এই টাকা জমিয়েছিলেন ছাত্র পড়িয়ে, টিভি আর ভিসিআর ঠিক করে, নিজের বানানো ডিশ অ্যান্টেনা আর টিউব লাইটের ব্যালাস্ট বিক্রি করে।”

2 Trackbacks / Pingbacks

  1. সিলেটে কাগজের উড়োজাহাজ বানানো প্রতিযোগিতা | রাজনীতি প্রতিদিন
  2. কাগজের উড়োজাহাজ বানানোর প্রতিযোগিতা

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*