চন্দ্র নাথের কীর্তিঃ কাটিং ফ্লুয়িডের যুগান্তকারী সমাধান

চট্টগ্রামের আনোয়ারা থানার খিলপাড়া গ্রাম। আধুনিকতার কোন আলোই এসে পৌঁছায়নি তখনও সেই গ্রামে। সন্ধ্যা নামতেই ঘরে ঘরে জোনাকির মতো জ্বলে ওঠে হারিকেন, ল্যাম্প। রাত গভীর না হতেই শেয়ালের ডাকে চারিপাশটা কেমন যেন থমথম করতে থাকে। ভোর হতেই শুরু হয়ে যায় চাষাবাদের কাজকর্ম। তারই ফাঁকে কোনরকমে স্কুলের পাট চুকিয়ে ঘরে ফিরে আবার নামতে হয় মাঠে, সাথে থাকত নানা গৃহস্থালি কাজ যা শেষ হতে কখনো কখনো গভীর রাতও পেরিয়ে যেত। পড়াশোনার একটু ফাঁক পাওয়া ছিল খুবই দুষ্কর। এই প্রতিকূলতার মাঝেও বড় হওয়ার স্বপ্ন ছিল তার চোখ জুড়ে। ছেলেটির নাম চন্দ্র নাথ। খিলপাড়া প্রাইমারী স্কুলের ছাত্র ছিলেন তিনি।

সময় গড়িয়ে গেছে, ছেলেটার বড় হওয়ার স্বপ্ন কমেনি বিন্দুমাত্র। মানুষের মতো মানুষ হওয়ার জন্য অনবরত সংগ্রাম করে গেছেন জীবনের প্রতিটি পদে। পারিবারিক আর্থিক অস্বচ্ছলতার মাঝে কষ্ট করে পার হয়েছেন প্রতিটা চড়াই-উতরাই। চট্টগ্রাম নেভী কলেজে এইচ.এস.সি. পড়ার সময়টা গেছে অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্টের মধ্যে। ১৯৯৫ সালে কলেজে ভর্তির পর থেকেই দিতে পারেননি বেতন, যেটা প্রতিমাসের নির্দিষ্ট একটা সময়ের মধ্যে দেয়া ছিল বাধ্যতামূলক। বকেয়া বেতন জরিমানাসহ পরিশোধের জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষের চাপ ছিল সবসময়, কিন্তু তিনি চাইতেন ক্লাসের পারফরম্যান্সে সবার থেকে ভালো করতে যাতে তার বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ না নেয় তাঁরা। ১৯৯৭ সালের শুরুতে রেজিস্ট্রেশনের সময় হয়ে যায় এক ঘটনা। টেস্ট পরীক্ষায় হয়েছেন প্রথম, কিন্তু কর্তৃপক্ষ চেয়ে বসল জমে যাওয়া বকেয়াসহ রেজিস্ট্রেশনের মোট ফি প্রায় সাড়ে ৫ হাজার টাকা। পরিবারের পক্ষে তা কোনরকমে পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছিল না। রেজিস্ট্রেশনের সময় গড়াল শেষদিনে। কলেজের বারান্দায় সবার সামনে অধ্যক্ষের রুমের কাছে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদছেন তিনি, যা তার বন্ধু-বান্ধব এবং শিক্ষকদের মনে এখনো দাগ কাটে। শেষ মুহূর্তে তাদের সবার আর্থিক সাহায্যে রেজিস্ট্রেশন করে দেয়া হল তার এইচ এস সি পরীক্ষা।

অসম্ভব অধ্যবসায়ের জোরে সুযোগ পান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট), যন্ত্রকৌশল বিভাগে। স্বপ্ন পূরণের যাত্রা সেই শুরু। পিছনে আর ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে, সফলতার সিঁড়ি বেঁয়ে তিনি এগিয়ে চলেছেন অবিরত। সফলতার সাথে শেষ করেন তার প্রকৌশল বিদ্যার পাঠ। এই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সবচেয়ে কম নম্বর পেয়েছিলেন ইন্ডাস্ট্রিয়াল এবং প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং (আই পি ই)-এর একটি কোর্স ‘প্রোডাকশন প্রসেসেস’ অর্থাৎ ম্যানুফ্যাকচারিং-এ। সবচেয়ে কম নম্বর পাওয়া সেই ম্যানুফ্যাকচারিং নিয়ে গবেষণায় এখন তিনি হয়ে গেলেন সারা পৃথিবীর ম্যানুফ্যাকচারিং গবেষক এবং ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত! নিজেকে নিয়ে গেছেন বিশ্বের সামনের সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধ্যাপক এবং বড় বড় কোম্পানির অভিজ্ঞ ম্যানুফ্যাকচারিং ইঞ্জিনিয়ারদের কাতারে।

ন্যাশনাল ইউনিভারসিটি অব সিঙ্গাপুর (NUS) থেকে ম্যানুফ্যাকচারিং –এ অধ্যাপক ডঃ মুস্তাফিজুর রহমান এর অধীনে পিএইচডি ডিগ্রী শেষ করে ২০১১ সাল থেকে পোষ্ট ডক্টরাল রিসার্চার হিসেবে অধ্যাপক ডঃ শিব কাপুর এর অধীনে তিনি এই বিষয়ে গবেষণা করছেন যুক্তরাষ্ট্রের সামনের সারির একটি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় অ্যাট আরবানা-শ্যাম্পেইন (UIUC)-এ। ম্যানুফ্যাকচারিং নিয়ে উচ্চমানর গবেষণা, সফলতা, এবং নেতৃত্বের অনন্য স্বীকৃতিস্বরূপ সম্প্রতি ম্যানুফ্যাকচারিং ইঞ্জিনিয়ারদের আন্তর্জাতিক সংগঠন The Society of Manufacturing Engineers (SME)-এর ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড এন্ড রিকগনিশন কমিটি ২০১৪ সালে তাকে দিয়েছে অত্যন্ত মর্যাদাসম্পন্ন Outstanding Young Manufacturing Engineer (OYME) Award। এবছর এই অ্যাওয়ার্ড-প্রাপ্ত পৃথিবীর সেরা ৬ তরুণ গবেষকদের মধ্যে চন্দ্র নাথ একজন। পোস্ট-ডক্টরেট লেভেলের গবেষক হিসেবে এরকম সাফল্য খুবই বিরল। যে গবেষণা কাজটি করে তিনি সারা পৃথিবীতে সাড়া ফেলে দিয়েছেন সেটি হচ্ছে এরোস্পেস, অফসোর (নৌযান বা মেরিন), অটোমোবাইল, এবং বায়োমেডিক্যালের যন্ত্রপাতি ও কৃত্রিম অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তৈরিতে বহুল ব্যবহৃত টাইটানিয়াম এবং নিকেলের সংকর ধাতু, স্টিল ইত্যাদি যেসকল ধাতব বস্তু স্বাভাবিক পদ্ধতিতে মেশিনিং করা খুব কষ্টসাধ্য (difficult-to-machine), তাদের মেশিনিং প্রসেসকে সহজ করার জন্য সম্পূর্ণ নতুন এক ধরণের ‘কাটিং ফ্লুয়িড অ্যাপ্লিকেশন সিস্টেম উদ্ভাবন এবং তা কার্যকরভাবে প্রয়োগের উপায়’ বের করা।

যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই গবেষণার বিষয়বস্তু আর ভিত্তি অনেক জটিল হলেও ডঃ চন্দ্র নাথ বিষয়টিকে করেছেন সহজসাধ্য।

যেকোনো ধরণের কাঠামোগত প্রক্রিয়ায় ব্যবহারের জন্য একটি ধাতব বস্তুকে কেটে প্রয়োজনমত একটি নির্দিষ্ট আকৃতিতে নিয়ে আসা হয়। মেটাল কাটিং এর ক্ষেত্রে সবচেয়ে যে বিষয়টি একটি কোম্পানির জন্য যন্ত্রণাদায়ক তা হচ্ছে এরকম মেটাল কাটার সময় টুল এবং যে বস্তু কাটা হচ্ছে তার মধ্যে ঘর্ষণের ফলে মাত্রাতিরিক্ত, যেমন ১০০০ থেকে ২০০০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা সৃষ্টি হওয়া। মেটাল কাটিং এর সময় এই তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে না পারলে টুল বা কাটার খুব তাড়াতাড়ি ক্ষয় হয়ে যায়। যার ফলে প্রক্রিয়াটা অনেক বেশি ব্যয়বহুল এবং কষ্টসাধ্য হয়ে যায়। এছাড়াও থাকে আমাদের কাঙ্ক্ষিত সেই আকারের বস্তু না পাওয়ার আশংকা, কারণ উচ্চ তাপমাত্রায় বস্তুর আঁকার সহজেই পরিবর্তন হয়ে যায়।

মেটাল কাটিং এর সময় টুলের কোণায় মাত্র ২-৩ বর্গ মিলিমিটার জায়গাজুড়ে এই উচ্চ তাপমাত্রার সৃষ্টি হয়, কিন্তু তা নিয়ন্ত্রণের জন্য সাধারণ পদ্ধতিতে মাত্রাতিরিক্ত হারে যেমন মিনিটে এক থেকে পাঁচ লিটার পর্যন্ত কাটিং ফ্লুয়িড ব্যবহৃত হয়। তাই ব্যবহৃত এই কাটিং ফ্লুয়িড এর খুব সামান্য অংশই এই উচ্চ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে আনার কাজে লাগে, বাকী প্রায় পুরোটাই অপচয় হয়। টার্নিং প্রসেস বা কাটার সময় বস্তু থেকে উৎপাদিত চিপ সর্বদা বের হওয়ার কারণে টুলের ওই অংশ ঢাকা থাকে, তাই ওই উচ্চ তাপমাত্রাও খুব একটা নিয়ন্ত্রণে আনা যায় না। ফ্যাক্টরিতে বিপুল পরিমাণ এই কাটিং ফ্লুয়িড যোগান দিতে কোম্পানিগুলোর এজন্য খরচ হচ্ছে বিপুল অর্থ। কাটিং ফ্লুয়িড আবার এক ধরণের কেমিক্যাল, যার অধিক ব্যবহারে ফ্যাক্টরির মেশিন শপের ভিতরে মেশিন অপারেটর এবং অন্যান্য লোকজন থেকে শুরু করে বাইরে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যহানি এবং পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। গত দশকে এক গবেষণায় দেখা গেছে উত্তর আমেরিকায় ম্যানুফ্যাকচারিং এর প্রসেসিং এ প্রায় ২ বিলিয়ন গ্যালন কাটিং ফ্লুয়িড ব্যবহার হয় এবং তাতে প্রায় ১.২ মিলিয়ন জনবল নিয়োজিত। প্রসঙ্গত, এই কাটিং ফ্লুয়িড নির্দিষ্ট একটা সময়ের পর ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে, কিন্তু উন্নত দেশে তা আবার যেখানে-সেখানে, যেমন নালা-নর্দমা বা নদীতে নিষ্কাশন করতে পারা যায় না। সরকার এই নিষ্কাশন এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোম্পানিগুলোকে একটা বড় অঙ্ক চার্জ করে।

সাধারণ এই পদ্ধতির পাশাপাশি, টুল এবং চিপের এই ক্ষুদ্র অভ্যন্তরীণ জায়গাটিতে কাটিং ফ্লুয়িড কার্যকরভাবে প্রয়োগের জন্য আরও কয়েকটি পদ্ধতির উদ্ভাবন হয়েছে, যাদের একটি হচ্ছে ‘হাই-প্রেশার (উচ্চচাপ) কুলিং সিস্টেম’।
এই পদ্ধতিতে কাটিং ফ্লুয়িডের চাপ যেহেতু সাধারণ কুলিং সিস্টেমের চেয়ে ৫-৫০ গুণ বেশি দেয়া হয়, তাই আরও অনেক বেশি কাটিং ফ্লুয়িড, যন্ত্রপাতি, এবং বিদ্যুৎ শক্তি খরচ হয়। যার কারণে শেষ পর্যন্ত তেমন একটা লাভজনক হয় না। উপরন্তু, আরও বেশি কাটিং ফ্লুয়িড এর ব্যবহার আমাদের জন্য ক্ষতির কারণ হয়। অন্য একটা পরিবেশ-বান্ধব পদ্ধতি আছে যেটা ‘ক্রায়োজনিক সিস্টেম’ নামে পরিচিত। এই সিস্টেমে তরল নাইট্রোজেন -১৯৬ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় প্রয়োগ করা হয় বলে মেটাল কাটিং এর সময় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণও ভালোমতো হয়। কিন্তু তরলীকরণ এবং তা সরবরাহে আবার অনেক খরচ পড়ে বলে প্রোডাক্টিভিটি শেষপর্যন্ত তেমন একটা হয় না। তার উপর এই অতি নিম্ন তাপমাত্রার তরল নাইট্রোজেন সরবরাহ মেশিন অপারেটরের জন্য খুব ঝুঁকিপূর্ণ। সামান্য এক ফোঁটা অসাবধানতা বশত তার ত্বকের সংস্পর্শে আসলে তা মুহূর্তেই অস্বাভাবিক ক্ষতি (ফ্রস্টবাইট) করে।

এই কাটিং ফ্লুয়িডের ব্যবহারের একটা কার্যকর সমাধান বের করার চ্যালেঞ্জ নিয়েই কাজ শুরু করেছিলেন চন্দ্র নাথ। তার উদ্ভাবিত ‘এটমাইজেশন-বেইসড কাটিং ফ্লুয়িড (ACF) স্প্রে সিস্টেম’ বানানো হয় একটা আল্ট্রাসনিক এটমাইজার, ছোট একটা ফ্লুয়িড ট্যাঙ্ক, উচ্চ-বেগ গ্যাস ডেলিভারি টিউব এবং দুইটা টিউব সম্বলিত একটা নজল অ্যাসেম্বলি দিয়ে। এটি দিয়ে টুলের উপর টুল-চিপের কাছে কাটিং ফ্লুয়িডের অতি ক্ষুদ্র কণা স্প্রে করা হয়। এতে ফ্লুয়িডের একটি খুব পাতলা ফিল্ম (২০-৪০ মাইক্রোমিটার পুরু) উচ্চবেগে প্রবহমান বা গতিশীল ফিল্ম উৎপন্ন হয়ে তা সরাসরি টুল এবং চিপের অভ্যন্তরীণ ছোট সেই জায়গায় সহজে ঢুকে যায়। যার ফলে তাপমাত্রা অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আনা যায় এবং ঘর্ষণ কমানো যায়। এই সিস্টেমে কাটিং ফ্লুয়িডের ব্যবহার মাত্র ১০-২০ মিলিলিটার যা সাধারণ কুলিং সিস্টেমের তুলনায় একেবারে নগণ্য (১-২% বা তার কম)।
কার্যকর পদ্ধতিতে প্রয়োগের কারণে এই নতুন সিস্টেমে টাইটানিয়াম কাটার সময় টুলের স্থায়িত্ব বরং ৩০-৫০ শতাংশ বাড়তে দেখা যায়।

ACF স্প্রেACF স্প্রে

যেহেতু এই সিস্টেমে কাটিং ফ্লুয়িড ডেলিভারি খুব কম, তাই এটি অনেক সুবিধা দেয়। অভিকর্ষজ টানের সাহায্যে এই কাটিং ফ্লুয়িড ডেলিভারি দেয়া যায় বিধায় কোন উচ্চমাত্রার বিদ্যুতশক্তি (৫০০-১৫০০ ওয়াট) চালিত পাম্প চালানো লাগে না। আর কোন দামি ফিল্টারও বসাতে হয় না, যেটা সাধারণ পদ্ধতিতে লাগে কাটিং ফ্লুয়িড পুনঃচালনার জন্য। এই সিস্টেমে কাটিং ফ্লুয়িড তেমন একটা অব্যবহৃত থাকেও না। যার ফলে পরিবেশের ক্ষতি ও স্বাস্থ্যহানির আশঙ্কা থাকে না। গ্যাস হিসেবে বায়ুর পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্বন–ডাই-অক্সাইডও ব্যবহার করা হয়, যা কলকারখানা, যেমন খাদ্য প্রক্রিয়াকরণে উচ্ছিষ্ট হিসেবে আসে। তাই বাতাসে কার্বন–ডাই-অক্সাইড এর পরিমাণও কমে তার নতুন উদ্ভাবিত এই কাটিং ফ্লুয়িড স্প্রে সিস্টেমে। উল্লেখ্য, এই সিস্টেমে একমাত্র বিদ্যুতশক্তি চালিত ইউনিট এটমাইজার, যেটা কাটিং ফ্লুয়িডকে অতি ক্ষুদ্র কণায় পরিণত করে, তা চালাতে খুব বেশি হলে ১৫ ওয়াট বিদ্যুৎ লাগে যা ঘরের একটা টিউব-লাইটের থেকেও কম।

উপরে বর্ণিত উল্লিখিত এসব সুবিধাদির কারণে মেটাল কাটিং বা অন্য ম্যানুফ্যাকচারিং এ এই সিস্টেম ব্যবহারে প্রোডাক্টিভিটি অনেক গুণ বেড়ে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। আবার অন্যদিকে এটা খুব পরিবেশ-বান্ধব। আর এটা এত ছোট যে, একটা মেশিন ল্যাবের যেকোনো মেশিনে সহজেই স্থাপন করা বা লাগানো যায়।

শুরুতে কাটিং ফ্লুয়িড প্রয়োগের একটা কার্যকর পদ্ধতি উদ্ভাবনের জন্য ফান্ডিং আসে যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইয়ো অঙ্গরাজ্যের একটা এরোস্পেস ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি, TechSolve Inc. থেকে। চন্দ্র নাথের উদ্ভাবিত এই কাটিং ফ্লুয়িড স্প্রে সিস্টেমের সফলতার কারণে পরবর্তীতে ওই ইন্ডাস্ট্রি এবং ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন (NSF) থেকে আসে আরও অনেক ফান্ডিং। এই সিস্টেমের কার্যকর প্রয়োগ নিয়ে তিনি এবং তার এডভাইজারের একজন মাস্টার্স এর ছাত্র অ্যালেক্স হয়ন এর করা একটি মৌলিক গবেষণা নিবন্ধ গত বছরের জুনে আমেরিকার উইসকনসিনে The American Society of Mechanical Engineers (ASME)-এর অধীনে আয়োজিত ইন্টারন্যাশনাল ম্যানুফ্যাকচারিং সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং কনফারেন্সে পেয়েছে একটা বেস্ট পেপার অ্যাওয়ার্ড (তৃতীয় স্থান)।
তার বিশ্ববিদ্যালয় গত বছরের মার্চে এই প্রযুক্তির একটি ইনভেনশন ডিসক্লোজার এবং জুনে একটি প্রভিশনাল প্যাটেন্ট ফাইল করেছে। এই প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা গত বছরের আগস্টে SME তাদের ম্যানুফ্যাকচারিং ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যাগাজিনের ‘Sustainability Progress’-এ হাইলাইট করেছে। SME-র এই অ্যাওয়ার্ড নিয়ে তার মেকানিক্যাল ডিপার্টমেন্ট বের করেছে বিশেষ ফিচার, যা খুবই গর্বের একটা ব্যাপার।

তার গবেষণার বিষয়টি দৃষ্টি আকর্ষণ করা শুরু করে অনেক দেশ-বিদেশের খ্যাতনামা গবেষকদের। বিশ্ববিখ্যাত কোম্পানি জেনারেল ইলেকট্রিক (GE) এই প্রযুক্তি নিয়ে তাদের আগ্রহের কথা ইতিমধ্যে জানিয়েছে। জেনারেল মটরস (GM) এর টেকনিকাল ফেলো ডঃ জন আগাপিউ এই প্রযুক্তিকে দেখছেন ম্যানুফ্যাকচারিং এর একটা বড় সাফল্য হিসেবে।

চন্দ্র নাথের বিশ্ববিদ্যালয় UIUC ল্যাবের বাইরে TechSolve Inc. তাদের ল্যাবেও এই প্রযুক্তির আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। এটি বাজারে আসতে হয়তো অপেক্ষা করা লাগবে আরও কিছু সময়।

ডঃ নাথ এই প্রজেক্ট ছাড়াও আরও কয়েকটি প্রজেক্টে কাজ করছেন। গবেষণার পাশাপাশি তিনি সেখানে ভিজিটিং লেকচারার হিসেবেও নিযুক্ত হয়েছেন গত আগস্ট থেকে। পিএইচডি-র পর যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানোর আগে সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্সটিটিউটে বিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করেছেন প্রায় দুই বছর। এডভান্সড মাল্টি-স্কেল ম্যানুফ্যাকচারিং নিয়ে তার গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নাল, কনফারেন্স এবং বইয়ের অধ্যায়ে। তিনি তার গবেষণা উপস্থাপন করেছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। তার মেধা আর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে নানা খ্যাতনামা সোসাইটি তাকে দিয়েছে স্কলারশিপ, অ্যাওয়ার্ড, এবং সম্মাননা। ২০০৯ সালে জাপানের কিতাকিয়োশোতে ‘প্রিসিশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর উপর আয়োজিত একটা ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্সে এশিয়ার ৬ টি দেশ জাপান, চীন, হংকং, থাইল্যান্ড, দঃ কোরিয়া এবং সিঙ্গাপুর এর ৬ জন তরুণ গবেষকদের মধ্যে স্থান করে নিয়েছেন ‘ইয়াং রিসার্চার অ্যাওয়ার্ড’ পেয়ে। বুয়েটে অধ্যয়ন-কালীন মেরিট, ডীন, রশীদ মেমোরিয়াল, বুয়েট’৭০ স্কলারশিপ, ইঞ্জিনিয়ার্স ক্লাব স্টাইপেন্ড, এবং জেলা-বৃত্তি সহ পেয়েছেন ২৬ টি বৃত্তি ডঃ জন আগাপিউ। গবেষণা-কালীন তিনি কয়েকজন ছাত্রকে তাদের রিসার্চ প্রজেক্টে সুপারভাইজ করেছেন এবং বর্তমানেও করছেন। এছাড়াও চন্দ্র নাথ চুয়েটে ২০০৫ সালে কিছুদিন শিক্ষকতা করেছিলেন যন্ত্রকৌশল বিভাগে।

নিজেকে সবসময় সাধারণ মানুষের কাতারে ভাবতেই পছন্দ করেন চন্দ্র নাথ। সফলতার স্রোতে নিজের দেশ, নিজের শিকড়কে ভুলতে রাজী নন বিন্দুমাত্র। গবেষণার ফাঁকে চেষ্টা করেন বাংলাদেশের সুবিধা-বঞ্চিত মেধাবী শিক্ষার্থী এবং দরিদ্র পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াবার। সে উপলক্ষে ২০০৯ সাল থেকে আনোয়ারা থানায় নিজের হাই স্কুল, যেখানে তিনি পড়াশোনা করেছেন, সেখানে মায়ের নামে একটা ট্রাস্ট ফান্ড খুলে প্রতিবছর সব শ্রেণির তিনজন শিক্ষার্থীকে দিচ্ছেন ছাত্রবৃত্তি। তিনি স্কুল-কলেজ জীবনে পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন হয়তো দুই থেকে দশ-বারো বছরের পুরানো বই দিয়ে নতুবা ক্লাসের এর-ওর কাছ থেকে বই ধার করে। স্কুলের শিক্ষকেরা ক্লাসের মনিটর হিসেবে তার কাছ থেকে বই চাইলে অন্যের কাছ থেকে নিয়ে দিতেন, কারণ নতুন বই দিয়ে পড়াতেই তাঁদের ছিল বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ।

নিজের এই কষ্টের অনুভূতি থেকেই জন্ম নেয় তার এই ট্রাস্ট ফান্ড গঠনের উদ্যোগ।

এই সাহায্যমূলক কার্যক্রম আরও বাড়ানোর জন্য গতবছর খুলেছেন ‘মানুষ মানুষের জন্য‘ নামের একটি চ্যারিটি ফাউন্ডেশন। এর উদ্যোগে আমেরিকা প্রবাসীদের থেকে সাহায্য তুলে দেশে পাঠিয়েছেন এই শীতে কয়েকটি কম্বল বিতরণের প্রজেক্টে। কম্বল বিতরণের সময় গরীব মানুষ এবং তাদের ছেলেমেয়েদের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার অভিব্যক্তি “১৯৯১-৯২ সালের কথা। চট্টগ্রামে মহাপ্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড়-পরবর্তী দিনগুলোতে এইসব অসহায় পরিবারের মানুষ, ছেলে-মেয়েদের মত আমি দাঁড়িয়েছিলাম বিশাল লম্বা লাইনে, পেটের ক্ষুধা চেপে। মাঝে মাঝে সন্ধ্যে গড়িয়েছে ওই লাইনে শেষ হতে। কখনো দাঁড়িয়েছি একটা কম্বলের জন্য, আবার কখনো দু’মুঠো চালের জন্য। কখনো কারো ধনী পরিবারের উঠোনে, আবার কখনো বা ইউনিয়ন বোর্ডের সামনে করিডোরে। “

একজন বাঙ্গালি চন্দ্র নাথের এই অসামান্য সাফল্য আমাদের সবার গর্ব, আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা!

Share Button

22 Comments

  1. অনেক ধন্যবাদ মাসুম এই আর্টিকেল এর পেছনে তোমার শ্রম এবং সময় দেবার জন্য। আমি খুবই সম্মানিতবোধ করছি। আমি অনেক খুশি হয়েছি, এই টেকনিক্যাল আর্টিকেলটি এই ভাষার মাসে বাংলায় প্রকাশিত হতে দেখে। মনের কোন একটা জায়গায় বেশ উৎফুল্ল লাগছে!

    এই আর্টিকেল এবং সম্মান বড় একটা অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে আমার চলার পথে, যা আমাকে আরো অনেক এবং ভালো কিছু করতে উৎসাহিত করবে। আমি খুব আনন্দিত হই প্রিয় স্বদেশের জন্য বাস্তবিক অর্থে যখন কিছু করতে পারি।

    • ভাইয়া, আপনার সেই মহান স্যারকে নিয়েও একটা লেখার ইচ্ছা আমার। 🙂
      আপনার জন্য একরাশ শুভকামনা থাকল এই ছোটভাইয়ের পক্ষ থেকে। 🙂

      • মাসুম, একদিন বলবো উনার কথা। অসাধারণ কিছু মানুষের হাত ধরে কত মানুষ যে উনার হাত ধরে উঠছে তা কল্পনারও বাইরে।

        কথা হবে।

    • চন্দ্রনাথ, তোমাকে আমার পক্ষ খেকে ধন্যবাদ। এতো কষ্টের মাঝেও হার না মেনে এতোদোর আসা আসলই অবিশ্বাস্য। শুনে খুবই গর্ববোধ হচ্ছে তুমি আমার স্কুল, পাশের গ্রামের এবং মামার বাড়ীর একজন। সুপ্লব চৌধুরী, সিংহরা ক্ষেত্রপাল বাড়ী।

      • সুপ্লব দা, অনেক ধন্যবাদ আপনার প্রশংসাও জন্য।

        আমার ধারণারও বাইরে ছিল আপনাকে কখনো আবার আমার গণ্ডিতে পাবো। ১৯৯৫ সালের পর আপনার আওয়াজ।

        আশীর্বাদ করবেন দেশের জন্য যাতে আক্ষরিক অর্থে কিছু একটা করতে পারি।

  2. খুব চমৎকার আর্টিকেল… পড়ে বেশ ভালো লাগলো… চন্দ্রনাথ দাদার উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করছি 🙂

    • পৃথ্বী দাদা,
      আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আপনারাই আমার অনুপ্রেরণার উৎস। আপনাদের মত খুব গুটি কয়েক ভালো মানুষ ছিল বলেই আমি এবং আমার পরিবারের সবাই আজ একটা অবস্থানে আস্তে পেরেছি। চেষ্টা করব আপনাদের আশা-আকাঙ্খা যতটুকু পারি পূরণ করতে। আশীর্বাদ করবেন!

  3. Dear Mr. Chandronath, when I start reading this article, I initially thought it may be some boy from village, make something from toys and a report is made for publicity stunts. WOW, now i feel so good to be wrong here. Your hard works and success is so inspirational for us, especially for the youth who are broadly reactive over negetive thoughts. You make us proud, really proud to the world. keep your hardwork and bring more honor for Bangladesh.
    Thanks
    Adnan

    • আদনান কবির সাহেব,
      আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আপনারা প্রশংসা আমার অনুপ্রেরণার উৎস সবসময়ই। চেষ্টা করব পড়াশোনার পাশাপাশি জনসেবা করে গরিব-দুঃখী মানুষের পাশে থাকতে। দোয়া করবেন যাতে আপনাদের আশা-আকাঙ্খা যতটুকু পারি পূরণ করতে পারি।

  4. আপনার এই অভাবনীয় আবিষ্কার এ গর্বিত বোধ করছি। অভিনন্দন আপনাকে। “চন্দ্রনাথ” বাঙ্গালী মেকানিক্যাল প্রকৌশলীদের এক ভবিষ্যৎ অনুপ্রেরক হিসেবে থাকবে।

    • অনেক ধন্যবাদ। আপনার কথাগুলো আমার উৎসাহ যোগাবে সবসময়।

  5. Dear Chandra Nath,

    Congratulation on your success. Alhamdulillah.

    Dr. Mohammad Ariful Haque
    Associate Professor, Dept of EEE, BUET
    Ex. Navy School Chittagong.

    • আরিফ ভাই,
      অনেক ধন্যবাদ। আমার এই সাফল্যের ভাগিদার কিন্তু আপনিও। বুয়েটের ১ম ও ২য় বর্ষে আপনার কাছে কত গিয়েছি। কত সাহায্য যে আপনি আমাকে করেছেন। অনেক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

      দোয়া করবেন যাতে আমি আগের সেই চন্দ্র নাথ – ই থাকি।

    • জয়ন্ত দা,
      অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। আপনি আমাকে সবসময় উৎসাহ দিয়ে গেছেন। আশীর্বাদ করবেন যাতে দেশ, দশ ও বিশ্বের সেবা করতে পারি গবেষণা আর জনসেবামূলক কাজ করে। ভালো থাকবেন।

  6. আপনার সাফল্য অন্যের অনুপ্রেরনার উৎস হোক । আপনাদের জন্যই বাংলাদেশ নিয়ে আমরা স্বপ্ন দেখি 🙂

  7. চন্দ্রনাথ দাদা,
    খুব ভাল লাগল article টা পড়ে। আপনার উত্তোরত্তর সাফল্য কামনা করি। চেষ্টা, সততা আর অদম্য ইচ্ছার কাছে সব বাধাই হার মানতে বাধ্য।-আপনি আবারো তা প্রমাণ করেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*