অন্ধের লাঠি! দৃষ্টি-প্রতিবন্ধীদের জন্য বুয়েট শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবন!

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১০ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বের ৬৭৩.৭৫ কোটি জনসংখ্যার মাঝে ৩.৯৪ কোটি মানুষই দৃষ্টিহীন। আর এছাড়াও আছেন ২৪.৬ কোটি মানুষ যাদের দৃষ্টিশক্তি নানা কারণে খুবই দুর্বল, তারা বিভিন্ন দৃষ্টি-সহায়ক যন্ত্রের সাহায্য নিয়ে তাদের অবস্থাকে উন্নত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এছাড়া বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৭ লক্ষ ৫০ হাজার মানুষ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। তাদের মধ্যে ৬ লক্ষের ক্ষেত্রে অন্যতম দায়ী কারণ হচ্ছে ‘চোখে ছানিপড়া’। প্রতিবছর এই অন্ধত্বের তালিকায় যুক্ত হচ্ছে আরও ১ লক্ষ ২০ হাজার মানুষ। সুষম খাবার এবং সঠিক যত্নের কারণও এসব ক্ষেত্রে যথেষ্ট দায়ী। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ প্রতিবছর হারাচ্ছে প্রায় ৩ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা!

ভাবতে পারেন? একটা মানুষ কিভাবে দিনের পর দিন এই পৃথিবীটা না দেখেই সময় পার করে যাচ্ছে! তার চারিপাশের মানুষজন, তাদের জগতকে না দেখেই এই জীবনটা পার কাটিয়ে দিচ্ছে! ঠিক এই সমস্যাকে অনুধাবন করেই এইসকল সমস্যাকে কম খরচেই সমাধানের জন্য বুয়েটের কম্পিউটার প্রকৌশল বিভাগের কিছু শিক্ষার্থি বানিয়েছেন একটি ডিভাইস। তারা সেটির উন্নয়ন করে নানা প্রতিবন্ধকতাকে একে একে সমাধানের মধ্য দিয়ে বর্তমানে সেটিকে খুব সহজেই ব্যাবহার করবার মতো পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন। সর্বপ্রথম এই প্রজেক্টটি সি.এস.ই. প্রোজেক্ট শো- ২০১১ তে সকলের সামনে আনা হয়।

একেবারে প্রথমদিকে এই ডিভাইসটি বানানো হয়েছিল ৩ টা শব্দোত্তর (আলট্রা-সনিক) সেন্সর ব্যাবহার করে। অন্ধ ব্যক্তির হাতের লাঠির সাথে লাগানো ডিভাইসের তিনটি সেন্সরের সামনে, ডানে এবং বামে সিগন্যাল পাঠানোর মাধ্যমে প্রায় ১৮০ ডিগ্রী কোণে কোন নিকটবর্তী বস্তুর দূরত্ব এবং অবস্থান নির্ণয় সম্ভব। এই সেন্সরগুলো থেকে যে সিগন্যাল পাওয়া যাবে সেটি শব্দ এবং কম্পনের মাধ্যমে যেকোনো ব্যক্তি তার মাথায় লাগানো সাধারণ হেড-ফোনের সাহায্যেই জানতে পারবেন। সামনের দিকে ৩ মিটার দূরত্বের যেকোনো বস্তুকে এই ডিভাইসের মাধ্যমে চিহ্নিত করা সম্ভব। তিনটা সেন্সরকে আলাদা আলাদা কিংবা চাইলে একসাথেও ব্যাবহার করা যাবে। পুনঃব্যবহারযোগ্য (রিচার্জেবল) ব্যাটারির মাধ্যমে এই ডিভাইসকে খুব সহজেই দীর্ঘক্ষণ ব্যাবহার করা যাবে।

image005 image004

ডিভাইসটি ব্যাবহারের ক্ষেত্রে তেমন কোনও জটিলতা নেই। লাঠির সাথে লাগানো ছোট্ট ডিভাইসটির দুই পাশে থাকবে দুইটি সুইচ যেগুলোর মাধ্যমে ইচ্ছামতো সেন্সরগুলো চালু বা বন্ধ করা যাবে। একটি ৫ ভোল্টের ছোট ব্যাটারির সাহায্যে পুরো ডিভাইসে পাওয়ার সাপ্লাই দেয়া হয়েছে।

যেকোনো মাধ্যমে, হোক তা মানুষ কিংবা অন্য কোন বাঁধা, সেখানে সেন্সর থেকে পাঠানো সিগন্যাল ফেরত আসবে। এই ফেরত আসা সিগন্যালকে পরবর্তীতে মাইক্রোকন্ট্রোলারে এনালাইসিস করে সে অনুযায়ী তথ্য যিনি এই ডিভাইসটি ব্যাবহার করবেন তাকে জানিয়ে দেয়া হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি হবে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই। জানানো হবে ভয়েস নির্দেশনা এবং কম্পন (ভাইব্রেশন)- উভয় প্রক্রিয়াতেই। বাজারে বিদ্যমান যেকোনো ধরণের হেডফোনই লাগানো যাবে এটির সাথে।

এই পরীক্ষামূলক ডিভাইসটি বানাতে খরচ হয়েছে সর্বমোট ৪০০০ টাকা। বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের ক্ষেত্রে এটিকে আরও উন্নত করে এবং ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে বাজারে আনতে খরচ পড়বে মাত্র ১০০০ থেকে ২০০০ টাকা। এধরণের ডিভাইস উন্নত বিশ্বে জনপ্রিয় হলেও সেগুলির মূল্য বাংলাদেশের মানুষের ক্রয়-ক্ষমতার নাগালের ঊর্ধ্বেই।

image010  image001

ভবিষ্যতে এই ডিভাইসটি নিয়ে আছে আরও অনেক পরিকল্পনা। এটির বর্তমান সেন্সর নতুনভাবে ডিজাইন করার মাধ্যমে এটিকে আরও ছোট এবং আরও কার্যকর করার পাশাপাশি এটির নানামুখী প্রয়োগ নিয়েও চিন্তা-ভাবনা করছেন দলের সদস্যরা।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল সম্প্রতি এটির নানান সু-দিক বিবেচনা করে তার শুভকামনা ব্যক্ত করেছেন।

দলের সদস্যগণ

মোঃ ইব্রাহীম রশীদ, ‘০৭ ব্যাচ, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও কৌশল বিভাগ, বুয়েট।
এ. বি. এম. ফয়সাল, ‘০৭ ব্যাচ, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও কৌশল বিভাগ, বুয়েট।
কাজী নাসির উদ্দিন, ‘০৭ ব্যাচ, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও কৌশল বিভাগ, বুয়েট।
তারেকুল ইসলাম সিফাত, ‘০৭ ব্যাচ, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও কৌশল বিভাগ, বুয়েট।
আশিক ইমরান, ‘০৭ ব্যাচ, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও কৌশল বিভাগ, বুয়েট।

পরামর্শদাতা

নাসিদ শাহরিয়ার, লেকচারার, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও কৌশল বিভাগ, বুয়েট।
খালেদ মুহম্মদ শাহরিয়ার, সহকারী অধ্যাপক, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও কৌশল বিভাগ, বুয়েট।
মোঃ আব্দুস সাত্তার, সহযোগী অধ্যাপক, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও কৌশল বিভাগ, বুয়েট।

Share Button

8 Comments

  1. Congratulations the team members and their advisors. It waa a much needed device for blind people in our country. Hope someone will come forword soon to get it in the local market

  2. All these innovations from BUET and the students of BUET should file for a patent in US. There are quite a bit companies who will take the idea from net and patent it as their own.

  3. আমরা আমদের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী পুর্নবাসন কেন্দ্রের জন্য আপনাদের উদ্ভাভিত লাঠিটির ব্যাপারে আগ্রহী।

    • আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ ভাইয়া। 🙂 এটা নিয়ে তো আমরা অনেকদুর যেতে পারছি, কেবল আপনাদের জন্যই। 🙂

    • We believe these types of projects should come out to upbuild the countries technological infrastructure. You are welcome to join us to change Bangladesh. 🙂

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*