রোবট কাটছে খাবার! সহজে, নিমিষেই!

লেভেল-৩, টার্ম-১ এর শুরুর দিকের কথা। ‘ইন্সট্রুমেন্টেশন এন্ড মেজারমেন্ট’ কোর্সের ল্যাবের জন্য প্রোজেক্ট করা লাগবে। তাই বিভিন্ন প্রোজেক্ট নিয়ে ইন্টারনেটে খোঁজাখুঁজি শুরু করলাম। প্রোজেক্ট আইডিয়া দরকার। প্রথমে ঠিক করলাম যে একটা যান্ত্রিক বাহুর (Robotic Arm) প্রোটোটাইপ বানাব যেটা কিনা দৈনন্দিন নানান খাবার কাটবার কাজে ব্যবহৃত হবে। তারপর, ঠিক করলাম আমরা শুধু রোবটিক আর্ম না বানিয়ে একটা পুরো যন্ত্রই বানিয়ে ফেলবো যা খাবার কাটাকুটির কাজে ব্যাবহার করা হবে। মানুষের জীবন চলার পথ সহজ করতে কাজে লাগবে।

ডিজাইনের জন্য আমরা বিভিন্ন যন্ত্রের কলা-কৌশল নিয়ে পড়াশুনা শুরু করি। সেক্ষেত্রে পাঠ্যবই এবং ইন্টারনেটের বিভিন্ন রিসোর্সেরও সাহায্য নিতে শুরু করি। কাটিং ব্লেড উঠানামা করানোর জন্য R.H Khurmi’র লেখা Theory of Machine বইতে একটা সুন্দর মেকানিজম পেয়ে যাই। সেটি ছিল ‘দ্রুত প্রত্যাবর্তনশীল গতীয় কৌশল’ (Quick return motion mechanism)। আমরা জানতে পারলাম এই কৌশলের মাধ্যমে একটা ডিসি মটরকে ঘড়ির কাটার দিকে বা বিপরীত যেকোনো একটি দিকে ইচ্ছামতো ঘুরিয়ে সহজভাবে কাটিং ব্লেড উঠানামা করানো সম্ভব।

ডিজাইন করার সময় ঠিক করা হল , আমরা কাটিং ব্লেডের উঠানামা ফিক্সড রাখব , আর যে পাটাতনের উপর খাবারটি থাকবে তা স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারবে। বৃত্তাকার ভাবে কোন কিছু কাটবার সময় নির্দিষ্ট কোণ পর পর নীচের পাটাতনটা ঘুরে যাবে , আর লম্বালম্বিভাবে কাটবার সময় নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর নীচের পাটাতন সরে যাবে। এভাবে একটা পিঁজা কিংবা বার্গার বা অন্য কোন খাবার কত টুকরা করা হবে তা ঠিক করা হবে। একজন ব্যবহারকারী কত টুকরা করতে চান তা বাটন চেপে আগেই ঠিক করে দিতে পারবেন। কাটার কাজ শেষ হলে টুকরাগুলো একটা ট্রেতে রাখবার জন্য আমরা ডিজাইন করলাম একটি র‍্যাক-পিনিয়ন সিস্টেম।

যন্ত্রকাটকঃ বুয়েট শিক্ষার্থীদের তৈরি রোবট
যন্ত্রকাটকঃ বুয়েট শিক্ষার্থীদের তৈরি রোবট

আমাদের এই যন্ত্রটি বানাতে অ্যালুমিনিয়াম , এক্রাইলিক প্লাস্টিক শীট সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছি। কাটিং ব্লেডের জন্য স্টেইনলেস স্টিল, আর মেশিনের কাঠামো তৈরিতে কাঠ ব্যাবহার করেছি আমরা । এইসব জিনিস কেনা হয়েছে পুরান ঢাকার নবাবপুর , ধোলাইখাল এবং নয়াবাজারের বিভিন্ন স্থান থেকে । প্রোজেক্টের মোটামুটি সব কাজই করা হয়েছে বুয়েটের মেশিন শপ এবং শিট মেটাল শপে। পুরো কাজ শেষ করতে সময় লেগেছে মোটামুটি ১ মাস।

ইলেক্ট্রিক্যাল যন্ত্রাংশ যা ব্যবহৃত হয়েছে তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ২ টা ডিসি মটর , আর ২ টা সারভো (Servo) মটর । একটা ডিসি মটর কাটিং ব্লেডের উঠানামা নিয়ন্ত্রণ করে, আর একটা মটর কাটিং এর পর টুকরাগুলো সরানোর কাজে ব্যবহৃত হয়। খাবারটি যেখানে কাটা হবে সেই পাটাতনকে চলাচল করার জন্য বা ঘুরানোর জন্য বাকী দুটি সারভো মটর ব্যাবহার করা হয়েছে। আর পুরো কাটিং প্রক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয় করার জন্য ব্যাবহার করা হয়েছে মাইক্রোকন্ট্রোলার (MCU) নির্ভর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ।

মেশিনটি শুধু খাবার টুকরা করবার জন্য ডিজাইন করা । বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে নির্দিষ্ট আকারের বিভিন্ন খাবার স্লাইস বা টুকরা করার প্রয়োজন পড়ে । যেমন , পিজা , কেক , বার্গার ইত্যাদি । এছাড়া সালাদ করা কিংবা সবজী এবং ফলমূল কাটবার জন্যও আমাদের এ মেশিনটি ব্যাবহার উপযোগী।

মেশিনটি বানাতে আমাদের খরচ হয়েছে , ১০ হাজার টাকার মত। কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের ক্ষেত্রে এটি মোটামুটি ৬ হাজার টাকাতেই বানানো সম্ভব।

আমাদের তৈরি মেশিনটি শুধু গোলাকার কোন কিছুকে সমান অংশে ভাগ করা কিংবা লম্বা কোন কিছুকে সমান সমান টুকরা করতে পারে। কিন্তু জটিল কোন আকারে এটি এখনও কাটতে পারে না। ভবিষ্যতে আমরা এটি নিয়ে কাজ করতে চাই। এছাড়া এটির কাজের গতি বাড়ানো এবং পুরো প্রক্রিয়াটিকে আরও নির্ভুলভাবে করার জন্য আমরা চেষ্টা করছি। হয়তো তখন আমরা নিজেদের তৈরি দেশী রোবটের মাধ্যমেই দৈনন্দিন কাজগুলো আরও সহজ করে আনতে পারব সকল স্তরের মানুষের জন্য।

দলের সদস্যগনঃ

১. চিরঞ্জীব চৌধুরী , যন্ত্র-কৌশল বিভাগ, বুয়েট।
২. আমিনুল হক খালেদ, যন্ত্র-কৌশল বিভাগ, বুয়েট।
৩. খন্দকার রাসেল আহমেদ, যন্ত্র-কৌশল বিভাগ, বুয়েট।
৪. আরহাম আমিন খান, যন্ত্র-কৌশল বিভাগ, বুয়েট।

Share Button

1 Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*