কুয়েটে মানব মস্তিস্ক নিয়ে তাজরিনের গবেষণা!

দেহের সবচেয়ে অদ্ভুত এবং জটিল যত সব কাজকর্ম ঘটে আমাদের মস্তিষ্কে। তার খবর বেশীরভাগই আমাদের অজানা, খুব কম কিছুই এখনও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন বিজ্ঞান-মনা মানুষেরা। আমরা কেন স্বপ্ন দেখি, বাস্তব জীবনে তার প্রভাব কতটা-এমন অনেক কিছুই জানার ইচ্ছা হয় আমাদের। শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে আমাদের স্বভাবজাত আগ্রহ অন্য মানুষের মনের কথা জানবার। এসব নিয়ে গবেষণাও হচ্ছে অসংখ্য। গবেষণায় অনেক ফলাফল পাওয়া যায়। এবং সেটির উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয় নিত্য-নতুন যন্ত্র। সেগুলি যেমন ব্যবহার হচ্ছে চিকিৎসা ক্ষেত্রে, তেমনি অপরাধী সনাক্ত করতেও। এই গবেষণার মুল ভিত্তি বলা যায় EEG বা Electroencephalography। প্রক্রিয়াটা অনেকটা এমন- আমাদের মস্তিষ্কে যখন কোন চিন্তা-ভাবনার উদয় হয় তখন সেখানে ইন্দ্রিয় অনুভূতির পরিবর্তনের কারণে খুব সামান্য পরিমাণে বিদ্যুৎ প্রবাহের সৃষ্টি হতে থাকে। এই তড়িৎ সিগন্যালকে বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংগ্রহ করে সময়ের সাথে তার ধরণ এবং প্রকৃতির তথ্য নেয়া হয়। হয়তো, ভাল কোন খাবার খাওয়ার সময় যেমনটি তথ্য আমরা পেতে পারি, তার সাথে পরীক্ষাতে ভাল ফলাফলের পর মানসিক আনন্দের ফলে পাওয়া যে তথ্য পাওয়া যাবে সেটির বড়ই অমিল। এসব তথ্য বিচার বিশ্লেষণের পরেই সিদ্ধান্ত নেয়া হয় একজন মানুষের মস্তিষ্কের ব্যাপারে। এধরণের পদ্ধতিতেই তৈরি হয় Artificial Intelligence বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

সারা বিশ্ব জুড়ে চলছে এই EEG প্রক্রিয়া নিয়ে তোলপাড়। বাংলাদেশও এই ক্ষেত্রে একেবারে পিছিয়ে নেই। খুব সামান্য পরিমাণে হলেও কিছু মেধাবী শিক্ষার্থী গবেষণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন এটি নিয়ে। আজ তেমন এক জনের সাথেই পরিচয় করিয়ে দেয়া হবে বুয়েটেকে। আড়ালে থেকে অনবরত কাজ করে যাওয়া প্রকৌশলী, তাজরিন আহমেদ।

আইডিয়াল স্কুলে এন্ড কলেজ থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পড়াশোনা শেষ করবার পর খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেক্ট্রনিক কৌশল বিভাগে ভর্তি হন তাজরিন আহমেদ। বাবা সফীরউদ্দিন আহমদ এবং মা সুরাইয়া বেগম দুজনেই পেশায় স্বনামধন্য চিকিৎসক। বুয়েটেক প্রতিনিধির সাথে তাজরিনের সাক্ষাৎকার প্রতিবেদন:

মানুষের আবেগ নিয়ে কাজ করতে কেন আগ্রহী হলেন?

আসলে মানুষের আবেগ নয়, প্রথমত ইচ্ছা ছিল বায়ো-সিগন্যাল প্রসেসিং নিয়ে কাজ করার। বায়ো-সিগন্যাল গুলোর মধ্যে EEG সিগন্যাল নিয়েই কাজ করার ইচ্ছা হল কারণ কুয়েটে এর আগে সুনির্দিষ্ট ভাবে অন্য বায়ো-সিগন্যাল যেমন ECG, Blood Pressure(BP), EMG নিয়ে আলাদা করে বিষদ ভাবে কাজ হলেও তখন পর্যন্ত EEG সিগন্যাল নিয়ে আলাদা
ভাবে কাজ তেমন একটা হয়নি। এ সম্পর্কিত বিভিন্ন গবেষণাপত্র পড়ার পর ইচ্ছা হয়েছিল বিভিন্ন ধরণের EEG সিগন্যাল নিয়ে কাজ করার, তবে সীমাবদ্ধ EEG এর তথ্য সংগ্রহ পদ্ধতি আর সীমিত সংখ্যক সাবজেক্ট অর্থাৎ যে সমস্ত মানুষের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হবে তাদের সংখ্যা স্বল্পতার কারণে প্রাথমিক ভাবে আমরা শুধুমাত্র ভার্সিটির অল্প কিছু সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রীর কাছ থেকে এবং সহজেই তৈরি করা যায় এমন কিছু মানবিক অনুভূতি নিয়েই কাজ করতে পেরেছি। আর তাছাড়া এই ধরণের মানবিক আবেগ-অনুভূতি গুলো কৃত্রিম ভাবে তৈরি করে সেই অবস্থায় সিগন্যাল সংগ্রহ করাটা অনেক মজার ও ক্রিয়েটিভ মনে হয়েছিল।

আমাদের বোঝার মত করে বলবেন কি করে EEG এর মাধ্যমে কিভাবে (আয়েশি ভঙ্গি, মানসিক কর্মব্যস্ততা, স্মৃতি সম্পর্কিত কাজ, আনন্দ এবং ভয়) মানুষের আবেগ বোঝা যায়?

মানবিক আবেগ-অনুভূতি বা মানসিক অবস্থা , মানুষের মস্তিষ্কের সঞ্চালন, মানবিক অভিব্যক্তি এবং বিভিন্ন পরিবেশগত অবস্থার জন্যে বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে বিশেষ বিশেষ কার্যাবলী প্রত্যেক ব্যক্তির শারীরিক উদ্দীপনা ও ভাবের সমন্বয়ে গঠিত। আবেগ-অনুভূতি কে প্রকৃত পক্ষে অনুভব করা যায় কিন্তু ভাষায় সংজ্ঞায়িত করা যায় না। মানুষের প্রেরণা, উপলব্ধি, চেতনা, স্পৃহা, সৃজনশীলতা, মনোযোগ, পরিকল্পনা, যুক্তি, শিক্ষা, স্মৃতিশক্তি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এ সব কিছুর পেছনেই মানুষের মানসিক অবস্থা এবং অভিব্যক্তি একটা বড় ভূমিকা পালন করে। এই নির্দিষ্ট অনুভূতি, প্রভাব এবং আচরণ অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তির নিজের কাছে অথবা বাইরের জগতের কাছে দৃশ্যমান হয় না বা বলা যায় বোধগম্য হয়না। কিন্তু মানুষের সকল অনুভূতিই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মানব মস্তিষ্কের বেশ কিছু প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে যা বাইরে থেকে বোঝা না গেলেও ব্যক্তি নিজের ভেতরে উপলব্ধি করতে পারে। প্রকৃতপক্ষে মানুষের সকল অনুভূতি মস্তিষ্কের নিউরনের উদ্দীপনা থেকেই তৈরি হওয়া সেই ব্যক্তির নিজস্ব উপলব্ধি মাত্র । এই কারণে মস্তিষ্ক দেহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হিসেবে এবং এর গঠনগত উদ্দীপনা এবং কার্যাবলী মানসিক অনুভূতি গবেষণার জন্য একটি সর্বজনীন স্বীকৃত ও ভাল টপিক হিসেবে কাজ করে।

আসলে সরাসরি ইইজি মেশিনের মাধ্যমে আবেগ-অনুভূতি বোঝার উপায় নেই, তবে এই মেশিনের সাহায্যে মানুষের কাছ থেকে বিভিন্ন অবস্থার EEG সিগন্যাল সংগ্রহ করা যায়। প্রকৃতপক্ষে যে কোন ধরণের সিগন্যাল থেকে তথ্য নেয়ার জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নিতে হয়। তাই আমরা আসলে একটি “EEG Signal Analysis System” গড়ে তুলে সেটির মাধ্যমে বিভিন্ন মানসিক অভিব্যক্তিগুলা চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছি। বেশ কিছু সংশ্লিষ্ট কার্যাবলী গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের পর আমরা এই সিদ্ধান্তে এসেছি যে, এ ধরণের একটি সিস্টেম গড়ে তুলতে হলে আগে থেকেই বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরী। সঠিকভাবে EEG সিগন্যালের উপর ভিত্তি করে মানসিক অবস্থা সমূহ নির্ধারণ করার জন্য, সর্বপ্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে একটি উপযুক্ত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ প্রোটোকল সিস্টেম ডিজাইন করা ও সেই উদ্দেশ্যে বিশেষ বিশেষ সুশৃঙ্খল পদক্ষেপ মেনে চলা । যেমন – বিভিন্ন মানসিক অবস্থা সমূহের বিভাগ, সাবজেক্ট নির্বাচন এবং প্রস্তুতি, প্রয়োজন অনুযায়ী যথেষ্ট ডাটা বা তথ্য-উপাত্ত আহরণ, সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল সংগৃহীত ডাটা বিচার-বিশ্লেষণ করে তাদের ভিতর থাকা বৈশিষ্ট্যগুলো চিহ্নিত করা এবং ডাটা সমূহকে নির্ধারিত মানসিক অবস্থা অনুযায়ী শ্রেণীবিভাগ করা।

পরিবেশগত প্রভাবের কারণে একজন মানুষকে একটি নির্দিষ্ট মানসিক অবস্থায় রাখার বিষয়টি এবং একই সাথে আবেগ অনুভূতি গুলো এত বিভিন্ন ধরণের হয়ে থাকে যে এগুলোকে চিহ্নিত এবং সংজ্ঞায়িত করাই অত্যন্ত কঠিন। এ কারণে আমরা প্রাথমিক ভাবে ৭ টি মানসিক অভিব্যক্তি নির্বাচন করেছি; আয়েশি ভঙ্গি, মানসিক কর্মব্যস্ততা, স্মৃতি সম্পর্কিত কাজ, অঙ্গ প্রত্যঙ্গের সঞ্চালন, আনন্দ, ভয় এবং সঙ্গীত উপভোগ। এই নির্ধারিত অবস্থা সমূহের সংগৃহীত সিগন্যাল সমূহের উপর তিন ধরণের অ্যানালাইসিস – statistical measures, Discrete Fourier transform (DFT) এবং Discrete Wavelet Transform (DWT) প্রয়োগ করেছি। এ ধরণের অ্যানালাইসিসের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে এই বিপুল পরিমাণ তথ্য-উপাত্তকে পরিমিত এবং ক্ষুদ্রায়িত আকারে নিয়ে এসে কিছু সংখ্যক তাৎপর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে উপস্থাপন করা এবং তারপর এই তথ্যসমুহকে মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম এর সাহায্যে শ্রেণীবিভাগ করা ও কিছু সংখ্যক জানা অবস্থার সিগন্যাল নিয়ে আমাদের এই সিস্টেম এ প্রয়োগ করে সিস্টেমের কার্যকারিতা উপলব্ধি করা।

যন্ত্র যদি মানুষের আবেগ বুঝতে পারে তাহলে কি ধরনের সুবিধা আমরা পেতে পারি?

এক কথায় বলতে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোন যন্ত্র যদি মানুষের আবেগ বুঝতে পারে তাতে করে সব চেয়ে বেশি সহায়তা থেরাপিস্ট ও মনোবিজ্ঞানীদেরই হতে পারে। এ ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ব্যবহার হচ্ছে মৃগীরোগীদের Epileptic Seizure এবং Localization of the Seizure Foci নির্ধারণ। আরেকটি সুপরিচিত ব্যবহার হচ্ছে যে সমস্ত রোগী Sleeping Disorder এ আক্রান্ত তাদের শারীরিক অবস্থা মূল্যায়ন।

হিউম্যান মেশিন ইন্টার‍-একশন (HCI)-এ এই ধরনের গবেষণা কি কাজে আসতে পারে?

হিউম্যান মেশিন ইন্টার-একশন (HCI) ক্ষেত্রে এই ধরনের গবেষণার ফল স্বরূপ মানুষের মস্তিষ্কের মাধ্যমে সরাসরি কম্পিউটারের সাথেই যোগাযোগ করা সম্ভব; যেমন কম্পিউটার তার ব্যবহারকারীদের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে তার আচরণ নিয়ন্ত্রন করতে পারে। কিছু উদাহরণ হতে পারে, একটি খেলা যখন খুব বিরক্তিকর বা খুব উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠে তখন খেলার স্তর বা লেভেল স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তন হওয়া। আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে কম্পিউটারের তার ব্যবহারকারীর মন-মেজাজ এর উপর নির্ভর করে গান, উইন্ডোজ ব্যাকগ্রাউন্ড ইত্যাদি পরিবর্তন করা। এই ধরণের মানুষ-কম্পিউটার যোগাযোগ (হিউম্যান মেশিন ইন্ট্যারএকশন) ইতিমধ্যে বাণিজ্যিক জগতে ব্যবহার করা হয়।

প্যারালাইজড বা পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষের জন্য এ ধরনের কাজ কি কোন সুবিধা দিতে পারবে?

যে সমস্ত মানুষ Paralised বা পক্ষাঘাতগ্রস্ত, গুরুতর পেশী রোগে ভুগছেন যেমন ALS বা অ্যামায়োট্রফিক ল্যাটেরাল স্ক্লেরসিস, যাদের অনেকেই পেশী সরাতে বা কথা বলতে সক্ষম না, একটি মস্তিষ্কের কম্পিউটার ইন্টারফেসিং এর মাধ্যমে তারা বাইরের জগতের সাথে যোগাযোগ করতে সক্ষম হতে পারে, এবং তাদের ক্লিষ্টতা পুরোপুরি না হলেও কিছু টা অন্তত লাঘব করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এই ধরনের গবেষণা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে কি কি পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

এই ধরণের গবেষণা অনেক বেশী প্রভাব ফেলতে পারে আমাদের বাংলাদেশীদের প্রাত্যহিক জীবনে। বর্তমানে দেখা যায় যে চিকিৎসা বিজ্ঞান অনেকটাই নির্ভর করছে বিভিন্ন রকমর টেস্ট এর ফলাফল আর রিপোর্ট এর উপর আর বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ এইসব টেস্ট এর ফলাফল দেয়া , সেগুলো লিপিবদ্ধ করে রাখা, এসব ফলাফল কে মানুষের কাছে সহজবোধ্য করা অর্থাৎ অধিক পরিমাণে বোধগম্য, সঠিক, স্বচ্ছ এবং প্রায় নির্ভুল ভাবে উপস্থাপনের কাজগুলো অত্যন্ত সফলতার সাথে করছে। এটা বিভিন্ন রকমের বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াতে প্রকৌশলীরা প্রয়োগ করছেন আরও ভাল ফলাফলের জন্যে কারণ বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ক্ষেত্র প্রধানত মানবকল্যাণের জন্য এবং মানুষের মানসিক ও শারীরিক অবস্থাগুলোর উপর BP, ECG, EEG এদের অনেক বেশী প্রভাব রয়েছে। এই ধরণের কাজগুলোর যেসব ফলাফল আসে তা ডাক্তার, মনস্তাত্বিক এবং সর্বোপরি স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ ও বায়োমেডিক্যাল প্রকৌশলীদের বিভিন্ন সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়াতে অনেক সাহায্য করে। আর এটা তো সর্বজনীন সত্য যে জাতীয় উন্নয়ন অনেকাংশেই নির্ভর করে রাষ্ট্রের নাগরিকদের স্বাস্থ্যের উপর কারণ একজন সুস্থ্য নাগরিকই পারে জাতিকে সুন্দর কিছু উপহার দিতে।

আমাদের দেশের জন্য এ ধরনের গবেষণা কতটা গুরুত্বপূর্ণ? এবং গবেষণার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এবং সাহায্য সহযোগিতা কতটা সহজলভ্য?

আমি সব চেয়ে যেটা ফলপ্রসূ বলে মনে করি, সেটা হচ্ছে যে এ ধরণের গবেষনা বর্তমানে উন্নত বিশ্বের দেশ গুলোতে প্রচুর পরিমাণে হচ্ছে, আর আমাদের দেশের মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের জন্যে এ ধরণের গবেষণা করে বাইরে কাজ শিখতে পারার সুযোগ পাবার সম্ভাবনা আরও বেশী জোরদার হয়েছে। পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন চিকিৎসা ব্যবস্থা ও যন্ত্রপাতি স্থাপনের কাজে দেশের দক্ষ বায়োমেডিক্যাল প্রকৌশলীদের নিয়োগ করা হবে যা কিনা বর্তমানে বাইরের দেশ থেকে আনা প্রকৌশলীদের দ্বারা করানো হয়ে থাকে। বাংলাদেশের মাল্টি-ন্যাশনাল কম্যুনিকেশন কোম্পানি গুলা আসার পরে এখন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা ডিপার্টমেন্ট শুরু করা হয়েছে আর তাতে প্রচুর মানুষের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনি করে হয়ত অতি শীঘ্রই বায়োমেডিক্যাল ডিপার্টমেন্টও শুরু হবে আর তাতে শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী ছাড়াও সর্ব স্তরের মানুষেরই উপকার হবে। এ ধরণের গবেষণার জন্যে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এবং সাহায্য সহযোগিতা খুব বেশী একটা সহজলভ্য নয়। আমি যে Data Acquisition System এ ডাটা নিতে পেরেছি তা অত্যন্ত সীমাবদ্ধ, প্রকৃত পক্ষে তার থেকে অনেক ভাল বিশ্বজনীন যন্ত্রে এ কাজ করা হয়ে থাকে, যাতে ছেলে-মেয়ে উভয় প্রকার সাব্জেক্ট এর ডাটা নেয়া সম্ভব অনেক বেশী সংখ্যক ইলেকট্রোড দিয়ে। এ ধরণের সরঞ্জাম ব্যবহার করতে পারলে কাজের মান নিশ্চিত ভাবে আরও বেশী বৃদ্ধি পেত ।

আপনাদের গবেষণার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি?

আসলে ইচ্ছা ছিল বিভিন্ন ধরণের EEG সিগন্যাল নিয়ে বিভিন্ন রকম বিচার-বিশ্লেষণ করার, তবে সীমাবদ্ধ EEG data acquisition system ও সীমিত সংখ্যক সাবজেক্ট পাওয়ার কারণে প্রাথমিক ভাবে আমরা শুধুমাত্র অল্প কিছু সংখ্যক ভার্সিটি স্টুডেন্ট এর কাছ থেকেই সহজেই তৈরী করা যায় এমন কিছু মানবিক অনুভুতি নিয়েই কাজ করতে পেরেছি। ভবিষ্যতে আর ও ভাল স্ট্যান্ডার্ড সিস্টেমের সাহায্য নিয়ে বিভিন্ন বয়স, উচ্চতা, ওজনের সুস্থ-অসুস্থ সাবজেক্টের কাছ থেকে বিভিন্ন স্টেটের ডাটা সংগ্রহ করে গবেষণার ইচ্ছে আছে, যাতে করে আমাদের কাজের প্রকৃত মান ও কার্যকারিতা আরও সঠিক ভাবে অনুধাবন করা সম্ভব ।
আপনার গবেষণার কাজে কুয়েটের শিক্ষক এবং আপনার সহপাঠীদের অবদান কতটুকু?
আমার গবেষণার কাজে সাহায্য করার জন্যে আমার থিসিস পার্টনার মনিরা ইসলাম ও আমাদের সম্মানিত সুপারভাইজার প্রফেসর ড. মহিউদ্দিন আহমাদ স্যারের কাছে আমি আন্তরিক ভাবে কৃতজ্ঞ আমাকে কুয়েট থেকে এই প্রাপ্তি অর্জনের সুযোগ করে দেয়ার জন্যে এবং তাঁদের সাথে কাজ করার সুযোগ পেয়ে আমি অত্যন্ত গর্বিত। গবেষণার কাজে সর্বাঙ্গীন ক্ষেত্রে স্যারের অবদান আসলে বলে শেষ করা সম্ভব না, তবে এটুকু বলতে পারি যে আমাদের সকলের সম্মিলিত শ্রম ও প্রচেষ্টার ফলেই সব সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া ও আমাদের গবেষণার কাজে আমার কয়েকজন বন্ধু সিগন্যাল দিয়ে সাহায্য করেছে, তাদের এই সাহায্য টুকু ছাড়া এই গবেষণা সম্পন্ন করা সম্ভব ছিল না। আমি তাদের প্রতি ও আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই।

আপনার জীবনের অনুপ্রেরণামূলক কোন ঘটনার কথা বলুন।

এই গবেষণা সংক্রান্ত এখন পর্যন্ত চারটি কনফারেন্স পেপার পাবলিশ করতে পেরেছি, প্রতিটা পেপার সাবমিশন করার মুহূর্ত গুলো ছিল আমার জন্যে অনেক বেশী অনুপ্রেরণার। প্রথম পেপার জমা দেয়ার সময়টাতে নির্ধারিত সময়ের শেষ দিনে এসে এটির কথা জানতে পারি। হাতে মাত্র ১২ ঘণ্টা ছিল, একটা পেপার কিছু দিন আগে থেকেই লেখা ছিল, সেটা নিয়েই ঐ দিন রাত প্রায় ১২ টা পর্যন্ত ডিপার্টমেন্ট এ কাজ করে, তারপর পেপার সাবমিট করে হলে ফিরেছিলাম। তৃতীয় পেপারটি সাবমিশন করার সময় রোযার দিন ছিল সেই সাথে ঐ দিন আমাদের ৪র্থ বর্ষের ২য় সেমিস্টারের শেষ পরীক্ষা ছিল। সব কিছুর পরও ঐ দিন রাতেও অনেক পরিশ্রম করে পেপার রেডি করে সাবমিট করেছিলাম, এমনকি সে দিন আমাকে অন্য ডিপার্টমেন্টের একজনের কাছে এমন একটি প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছিল- “আমার হলে কি নেট এর কানেকশন নেই? আমি ৪র্থ বর্ষের স্টুডেন্ট হয়ে সুপারভাইজার এর সাহায্য ছাড়া একা একা কেন পেপার সাবমিট করতে পারি না? আমাকে ডিপার্টমেন্ট এ থেকে কেন পেপার সাবমিট করতে হবে?” তখনও জানতাম না পেপার গুলো গ্রহণ করা হবে কিনা। গবেষনার কাজটি হয়ত অনেক ছোট হতে পারে, কিন্তু তারপরও এর পেছনে কষ্ট, শ্রম ও সময় বড় কোন কাজের থেকে কোন অংশেই কম দিইনি। এই সমস্ত স্মৃতি গুলোই অনেক তুচ্ছ মনে হলেও আমার জন্যে অনেক অনেক বেশী অনুপ্রেরণামূলক।

Share Button

1 Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*