সাইনপালস-এর বিশ্বমানের প্রযুক্তিপণ্য

আমাদের পরিচিত কিছু বাক্যের ভিতর অন্যতম একটা হচ্ছে: Made in China. আশেপাশের অসংখ্য ইলেকট্রনিকস যন্ত্রপাতির গায়ে এই লেখাটা সচরাচর দেখতে পাওয়া যায়।

আচ্ছা, যদি কখনও আপনার স্যামসাং গ্যালাক্সি ফোনটার পিছনে লেখা দেখতে পান, Made in Bangladesh! খুব অবাক হয়ে যাবেন কিনা? সাইফ-তানিয়া দম্পতি ঠিক এই স্বপ্নটিকে নিয়েই শুরু করেছেন তাদের পথচলা। তারা স্বপ্ন দেখেন, বাংলাদেশেই থাকবে স্যামসাং এর মতো বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান, সেখানে যারা কাজ করবে তাদের সিংহ ভাগই হবে বাংলাদেশী। প্রযুক্তির নানান খাতে যাদের থাকবে অবাধ বিচরণ।

শুরুটা বেশ অনেক আগে। সাইফ সাইফুল্লাহ তখন কিশোর। নতুন কিছু করবার চিন্তার শুরু তখন থেকেই।  বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রযুক্তি নিয়ে কিছু করার মাধ্যমে অবদান রাখার সিদ্ধান্ত তখনই চূড়ান্ত করে ফেলেন। ছোটবেলার এই স্বপ্ন নিয়ে চলার পথে পাশে পেয়েছেন তানিয়া রহমানকে। তানিয়া রহমান তার সহধর্মীনি। পেশায় দুজনেই তড়িৎ প্রকৌশলী। তাদেরই মিলিত প্রচেষ্টার ফসল জার্মানীতে প্রতিষ্ঠিত সাইনপালস (SinePulse) এবং বাংলাদেশের AplombTech BD.

সাইফ-তানিয়ার পরিবার
সাইফ-তানিয়ার পরিবার

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে তড়িৎ কৌশলে পড়াশোনা সম্পন্ন করে তারা উচ্চ শিক্ষার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান জার্মানিতে। অনেক চড়াই উৎরাই পার হয়েছেন সেসময়। শিক্ষা জীবনের শুরু থেকেই দুজনের ইচ্ছা ছিল এই দেশটার জন্য কিছু করার। উদ্যোক্তা হবার দীক্ষা গ্রহণের শুরু বুয়েটে অধ্যয়নের সময় থেকেই, বের করেছিলেন অর্থ উপার্জনের পথ। জার্মানির ইউনিভার্সিটি অব ক্যাসেলে পড়াশোনার পাশাপাশি সাইফ এবং তানিয়া দুজনে যোগাযোগ করতেন সেখানকার নানান দোকানে। তাদের কাছে জানতে চাইতেন তারা বাংলাদেশ থেকে কোন প্রোডাক্ট নিতে আগ্রহী কিনা। তখন তাদের নিজেদের কাজের বা প্রোজেক্টের কোন অংশ বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া সম্ভব কিনা চিন্তা করতেন, কিছুটা যদি নতুন ছেলেমেয়েদের জন্য চাকরীর সম্ভাবনা তৈরি হয় তাতে।

দুজনেই কাজ করেছেন Infineon, Siemens আর Intel এর মতো নামকরা প্রতিষ্ঠানে। দিন যাওয়ার সাথে সাথে দেশে ফিরবার ইচ্ছাটা তাদের প্রবল হতে থাকে সেসময়। দেশে ফিরে প্রযুক্তি নিয়ে কিছু করার জন্য খুব ইচ্ছা ছিল দুজনের মাঝেই। কিন্তু সেসময় নির্দিষ্ট কোন আইডিয়া চুড়ান্ত করে উঠতে পারছিলেননা। Qimonda তে চাকরী করবার সময় কোম্পানিটির জামানত ব্যাংকের কাছে বাজেয়াপ্ত হয়। চাকরী হারান দুজনে। এই সময়টাতে উপলব্ধি করেন যে এখনই তাদের স্বপ্ন পূরণের যাত্রা শুরু করার সঠিক সময়। শুরু করেন GPS এর মাধ্যমে যানবাহন সনাক্তকরণের প্রযুক্তি উদ্ভাবন। বেঁছে নেন প্রিয় বাংলাদেশকে। বানানো শুরু করেন বনানী ও ধানমন্ডি এলাকার ডিজিটাল ম্যাপ। এই কাজের মাধ্যমেই নিজেদের মাঝে খুঁজে পান আত্মবিশ্বাস। বিশ্বাস জন্মায় যে তারা প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে সক্ষম।

তাদের প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান SinePulse. বাংলাদেশী কোন উদ্যোক্তার নিজেদের প্রয়াসে গঠিত পুরোপুরি বিশ্বমানের বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্যতম। নিজেদের উচ্চ মাত্রার কম্পাংকের সিগন্যালের গবেষণার জের ধরে আরও নানান প্রযুক্তির মেলবন্ধন ঘটিয়ে তাদের প্রতিষ্ঠান উৎপাদন করতে শুরু করেছে নামকরা আন্তর্জাতিক কোম্পানির সমতুল্য সব ইলেকট্রনিক প্রোডাক্ট। সম্প্রতি বাংলাদেশে শুরু করেছেন তাদের কার্যক্রম, AplombTech BD নামে গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের মাধ্যমে। কিছুদিন আগে হয়ে যাওয়া ICT মেলাতে প্রথমবারের মতো সামনে এনেছেন তাদের নিজেদের উদ্ভাবিত কিছু বাণিজ্যিক পণ্য।

এগুলোর মধ্যে আছে:

Smart Meter: এটির মাধ্যমে কোন ব্যবহারকারী তার বাসার সকল বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা ইন্টারনেটের মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।meterচাইলে বন্ধ করে দিতে পারবেন নির্দিষ্ট সংযোগ। মাস শেষে বিল দিতে পারবেন মোবাইল ফোন বা অনলাইনেই। এটা তথ্য আদান প্রদানের দিক থেকে এক ধরণের দ্বি-মুখী ডিজিটাল মিটার। বৈদ্যুতিক বিষয়াবলী মনিটরিং এর পাশাপাশি চাইলে যে কারো বাসার সৌর প্যানেল থেকে তৈরি হওয়া বিদ্যুৎ বিক্রিও করতে পারবেন অন্য কারো কাছে। আছে আরও অনেক সুবিধা।

Smart Home Automation: বাংলাদেশের কোন প্রতিষ্ঠানের হয়ে সম্ভবত তারাই সর্বপ্রথম স্মার্ট ফোনের মাধ্যমে ঘরের লাইট ফ্যান সহ সকল ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তি নিয়ে এসেছেন মানুষের নাগালে। শুরু করেছেন এটির বাজারজাতকরণের প্রক্রিয়া।

Indoor Positioning System: কোন কোম্পানি কিংবা বাসার ভিতর চলাচলের জন্য রোবটের মাধ্যমে সেই কোম্পানি বা বাসার ডিজিটাল ম্যাপ বানাতে সক্ষম এবং নানাবিধ কাজ সমাধার জন্যই তাদের এই প্রযুক্তি। বানানো ম্যাপ অনুযায়ী বিভিন্ন কাজের জন্য বিভিন্ন রোবটের মাধ্যমে মানুষের কাজকে সহজ করাই এই দেশীয় প্রযুক্তির উদ্দেশ্য।smart

Civil Drone: সাইফ-তানিয়ার প্রতিষ্ঠানের বানানো ড্রোনটি বাংলাদেশী কোন প্রতিষ্ঠানের দ্বারা বানানো সর্বপ্রথম স্বয়ংসম্পূর্ণ ড্রোন। এটির মাধ্যমে সারভেইল্যান্স, এরিয়াল ফটোগ্রাফি, ত্রিমাত্রিক ভিডিও ধারণ সহ রিমোট ডাটা একুইজিশনের কাজ করা সম্ভব খুব দারুণভাবে। বিস্তর গবেষণার পর নানান প্রযুক্তিগত সিগন্যাল প্রসেসিং এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সমন্বয় ঘটেছে তাদের এই ড্রোনে। তাদের গবেষক দল এখনও চালিয়ে যাচ্ছেন এটির উন্নয়নের কাজ।

Medical equipments: সাইনপালসের পক্ষ থেকে এরইমধ্যে অত্যাধুনিক ইসিজি যন্ত্র বানানো হয়েছে। নিজেদের দক্ষতাকে ঝালিয়ে নিয়ে শুরু করবেন বাজারে থাকা নানান মেডিকেল সায়েন্সের প্রযুক্তির উন্নয়নের কাজ।

এসব ছাড়াও সাইনপালস অনেক ধরণের বৈচিত্র্যময় উচ্চ প্রযুক্তি নিয়েও বর্তমানে কাজ করছে। কিডন্যাপিং রোধ করার জন্য প্রযুক্তির উদ্ভাবনে কাজ করছে । তাদের গবেষক দল। এসব নিয়ে গবেষণার পিছনে আর.এফ. বা উচ্চতর বেতার তরঙ্গের উপর তাদের গবেষনায় বর্তমানে বেশী গুরুত্ব । দিচ্ছেন তাদের রিসার্চ এবং ডিজাইনিং দল।

বুয়েটেকের সাথে একান্ত আলাপচারিতায় সাইফুল্লাহ তাদের দুজনের স্বপ্ন নিয়ে অনেক কথা বলেন। তাদের মতে, বাংলাদেশের সামনে বর্তমানে অনেক সম্ভাবনা এবং সে সাথে নানাবিধ সমস্যাও বিদ্যমান। বিভিন্ন আঙ্গিকের এই সমস্যাগুলি রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব নই। এজন্য প্রয়োজন সকলের সম্মিলিত প্রয়াস, সরকারের পক্ষ থেকে সাহায্য আর দেশের রাজনৈতিক স্থিরতা। এসময় নারীদের শিক্ষার গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন তারা। সাইফ সাইফুল্লাহ এবং তানিয়া রহমান মনে করেন, তাদের AplombTech BD প্রতিষ্ঠানটি সম্ভাবনাময় এবং মেধাবী প্রকৌশলী, চিকিৎসক এবং ব্যবসায় কুশলীদের জন্য বাংলাদেশেই একটি আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠান। এখানে আছে বন্ধুসুলভ গবেষণা ও কাজের পরিবেশ। এই প্রতিষ্ঠান থেকে দেশের বাইরে উচ্চ ডিগ্রী অর্জনে গবেষকদের গমন এবং উচ্চ ডিগ্রী অর্জন শেষে দেশে ফিরে বিশ্বের সর্বশেষ প্রযুক্তিগুলো নিয়ে কাজের শুরু এগুলোরই ইঙ্গিত বহন করছে। তাদের প্রতিষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানান দেশের মেধাবী মুখগুলোকে, দেশের জন্য যাদের কিছু করার ইচ্ছা অনেক বেশী। সামাজিক দ্বায়বদ্ধতা থেকে সাইফ-তানিয়া অংশ গ্রহণ করছেন নানান সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে।

এই উদ্যোক্তা দম্পতি বাংলাদেশী মেধাবী তরুণদের জন্য কাজের সুযোগ করে দিতে চান তাদের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। তারা বিশ্বাস করেন, তারা ব্যক্তি পর্যায়ের সুনামের চেয়ে প্রতিষ্ঠান তথা সারা বাংলাদেশের নাম বিশ্বের বুকে ছড়িয়ে দিতে পারবেন তাদের কাজের মাধ্যমে। দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্য শুভকামনা প্রকাশ করেন তারা। প্রথমের কয়েক বছর সংগ্রামের এবং কষ্টের পথে নিবিড়ভাবে চলতে পরামর্শ দেন, এরপরেই তাদের কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন পূরণ হবে সে আশার বানী পৌঁছে দেন তাদের জন্য। তরুণ উদ্যোক্তাদেরকে প্রযুক্তি উদ্যোগ নিয়ে মাঠে নামার পূর্বেই সকল সম্ভাবনা এবং ঝুঁকি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করার পরামর্শ দেন তারা।

বাংলাদেশ আর জার্মানির প্রযুক্তির একটা সেতুবন্ধন তৈরি করতে চলেছেন সাইফ সাইফুল্লাহ এবং সহধর্মীনি তানিয়া রহমান। প্রযুক্তির এই ঢেউটা এখন জার্মানি থেকে বাংলাদেশের দিকে বয়ে আসছে। একদিন হয়তো এই স্বপ্ন-পিয়াসী মানুষগুলোর মেধাবী উদ্যোগের জের ধরেই গার্মেন্টস শিল্পের মতো আমরা প্রযুক্তি পণ্যও রপ্তানি করতে পারব সারা বিশ্বে। ফিরতি ঢেউটার তোড়ে দেশটা তখন আর পিছিয়ে পড়াদের দলে থাকবেনা। দেশীয় প্রযুক্তি নিয়ে মাথা উচু করবে বাংলাদেশ।

Share Button

3 Comments

1 Trackback / Pingback

  1. সাইনপালস-এর বিশ্বমানের প্রযুক্তিপণ্য | banglascienceandhealth

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*