বাক্‌শোভরা বিজ্ঞানঃ শিক্ষা দেশের জন্য

একদল ছেলেমেয়ে। সত্যজিতের ‘বাক্স রহস্যের’ মতো ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে। ক’জনই বা খেয়াল রাখে তাদের দিকে। ছেলেমেয়েগুলোর কয়েকজনকে হয়তো এই দেখা গেল ঘরের ভেতর ঠাসাঠাসি করে বইপত্র সামনে রেখে কী কী সব যন্ত্রপাতি বানানোয় ভীষণ মনোযোগ। আবার তাদেরকেই হয়তো দেখা গেল বাক্স কাঁধে নিয়ে কোন স্কুলের গেইটে ঢুকছে। কিংবা সায়দাবাদ বাস টার্মিনালে বাসের সিটে বসে আছে, কোলের উপর তখনও বাক্স। সব ক্ষেত্রেই দুটো ঘটনাতে ভীষণ মিল এদের মাঝে। তারা সবাই সেই একই মানুষ। আর তাদের চোখের মাঝটা জ্বলজ্বল করছে, স্বপ্নভরা চোখের একেকটা তরুণ-তরুণী।

এইসব তরুণ তরুণী সকলেই শিক্ষার্থী। প্রত্যেকেই পড়েন বাংলাদেশের নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে। পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করেন নিজেদের স্বপ্ন-পূরণে। সেই স্বপ্ন আর দশটা মানুষের স্বপ্নের চেয়ে খানিকটা আলাদা। তাদের স্বপ্ন ঘিরে আছে অন্য মানুষেরা। ছোট ছোট বাচ্চারা। যারা স্কুলে পড়ে, যারা পড়াশোনার দিক থেকে নানা ধরণের সুযোগ সুবিধা-বঞ্চিত। বই পড়তে যাদের কেবল মুখস্থ বিদ্যাটাই ভরসা। সেইসব গ্রাম এবং মফস্বলের শিক্ষার্থীদের জন্য তারা বেঁছে নিয়েছেন তাদের স্বপ্ন পূরণের পথ। তাদের কাছে বিজ্ঞানকে আনন্দের বস্তুতে পরিণত করার পথ। পড়াশোনাকে সহজ আর খুব মজার করে উপস্থাপন করার জন্য এই তরুণ তরুণীরা সবাই কাজ করছেন দলবেঁধে।

‘শিক্ষা দেশের জন্য’ নামের উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে দেশের শিক্ষা পদ্ধতির গতানুগতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার চেষ্টা শুরু করেছেন এই শিক্ষার্থীরা। বুয়েটের যন্ত্রকৌশলে পড়ুয়া তানভীর আরাফাত ধ্রুব, ইমতিয়াজ আহমেদ, হাসান আল রাযী এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ পড়ুয়া ফাতিমা আমিনের হাত ধরে এই উদ্যোগের পথচলা শুরু। শুরুতে এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত অধিকাংশই ছিলেন বুয়েটের শিক্ষার্থী। ক্রমে অন্যান্য আরও বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজের স্বেচ্ছাসেবীরাও যুক্ত হতে থাকেন তাদের সাথে। ‘শিক্ষা দেশের জন্য’র পরিকল্পনা খুব চমৎকার। বর্তমান পাঠ্যপুস্তকের বিজ্ঞান বিষয়ের নানান টপিক শিক্ষার্থীরা যাতে মজা করে বুঝতে পারে সেই ব্যবস্থা করছেন তারা। সবাই মিলে বানাচ্ছেন টুলবক্স। সেই টুলবক্সে আছে অসংখ্য মজার মজার যন্ত্রপাতি। স্কুলে কিংবা কোন সেমিনারে বাচ্চাদেরকে বইয়ের এই নানা টপিকের নানা যন্ত্রগুলো দেখানো হয়। হাতেকলমে দেখানো হয় মজার মজার সায়েন্স এক্সপেরিমেন্ট।

২০১২ সালের মার্চ মাসে ‘শিক্ষা দেশের জন্য’র পথচলা শুরু। নিজেদের উদ্যোগে বিনা পারিশ্রমিকে বাংলাদেশের ছয়টি বিভাগের বিভিন্ন জেলাতে ক্যাম্পেইন করেছেন তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা সর্বপ্রথম যোগাযোগ করে থাকেন স্কুল কর্তৃপক্ষের সাথে। এরপর দিন-তারিখ ঠিক করে সেখানে হাজির হয়ে যায় ‘শিক্ষা দেশের জন্য’র টিম। সচরাচর ক্লাস রুটিনের সাথে সময় মিলিয়ে তারা ক্লাসরুমে যেয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে দেন বিজ্ঞানের আনন্দ। বইয়ের টপিকের যন্ত্রটি একেবারে সামনাসামনি দেখতে পেয়ে ছোট ছোট বাচ্চারা বড্ড বেশী অবাক হয়। এমন ঘটনা এর আগে তো কখনও ঘটেনি তাদের সাথে।

হয়তো পদার্থবিজ্ঞান বই পড়ে কোন শিক্ষার্থী ক্যামেরা কিভাবে কাজ করে তার সাথে পরিচিত। কেবল বই পড়ে তাদের মাঝে ক্যামেরা বস্তুটির কার্যকারিতা নিয়ে বেশ ঘোলাটে ভাব থাকে। ‘শিক্ষা দেশের জন্য’ টিমের কাছে এক ধরণের হাতে বানানো ক্যামেরা আছে। তারা সেগুলো খুব যত্ন করে শিখিয়ে দেন বাচ্চাদেরকে। ত্রিকোণমিতির নানা সূত্র থেকে শুরু করে করে অগুনিত জটিল সূত্রকে হরেক রকম এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে তারা সহজ করে আনন্দদায়কভাবে উপস্থাপন করেন শিক্ষার্থীদের কাছে। দেখান নিউটনের বর্ণচাকতি, দূরবীণ কিংবা সলিনয়েডের মতো বিজ্ঞানের আরও শতাধিক বিষয়ের চাক্ষুস কর্মপদ্ধতি। ছোট ছোট বাচ্চারা খুব আগ্রহ নিয়ে তাদের কথা গিলতে থাকে। তাদের গোল গোল চোখ আরও বড় বড় হয়ে যায়!

IMG_9703

‘শিক্ষা দেশের জন্য’র স্বেচ্ছাসেবীদের নিজেদের পরিশ্রমে এবং উদ্যোগে বানানো এমন যন্ত্র এবং টপিকের সংখ্যা শতাধিক। প্রতিনিয়ত তারা চিন্তা করে বুদ্ধি বের করেন নতুন নতুন যন্ত্রের। যাতে শিক্ষার্থীদের কাছে পড়াশোনা আরও মজার হয়ে ওঠে। নিজেরা কাজের সুবিধার্থে ৩ টা দলে বিভক্ত হয়ে কাজ করেন-

১) থিওরি টিম।

২) ইন্সট্রুমেন্টাল টিম।

৩) দৌড়ঝাঁপ টিম।

যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো শিক্ষার্থী যুক্ত হতে পারেন ‘শিক্ষা দেশের জন্য’র এই সেবামূলক কার্যক্রমের সাথে। সেজন্য আপনার তথ্য দিতে পারেন এখানে: http://bit.ly/1qQUMCp  অথবা হালনাগাদ তথ্যের জন্য চোখ রাখতে পারেন ‘শিক্ষা দেশের জন্য’র ফেসবুক পেইজে

ঢাকার পাশাপাশি আশেপাশের বেশকিছু জেলার নানা স্কুলে নিয়মিত কর্মশালা আয়োজন করে থাকে ‘শিক্ষা দেশের জন্য’। তাদের অন্যতম স্বপ্ন চলমান মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত বিজ্ঞানের বইগুলো আরও অনেক আনন্দদায়ক ভাবে পুনর্গঠন করে শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন করা। যেন বইয়ের অধ্যায়গুলো থেকে তারা সত্যিকারের বিজ্ঞানের আনন্দ লাভ করতে পারে। ‘শিক্ষা দেশের জন্য’ পরিবারের স্বপ্ন নিজের শিকড়ের টানে যেন প্রতিটা মানুষ এই দেশটার উন্নতির জন্য কাজ করতে এগিয়ে আসে এবং তাদের এই পথচলাতে আগ্রহী মানুষেরা যেন সর্বক্ষণ পাশে থাকেন।

তাদের স্বপ্ন দেশটাকে একদিন শিক্ষার বদৌলতে পরিবর্তন করে দেবার।

Share Button

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*