৩ তরুণের ১৬ লাখ স্বপ্নকথাঃ ‘ইচ্ছেকোড’!

বুয়েটে ৩য় বর্ষে পড়ুয়া ৩ জন শিক্ষার্থী। আরিফুজ্জামান ফয়সাল, আসিফ ইকবাল এবং সাহেদ এজাজ রাজন। এদের প্রত্যেকেই টিউশনীকে সময়ের প্রয়োজনে অস্থায়ী পেশা হিসেবে বেঁছে নিয়েছেন। টিউশনী করে, মাসিক একটা ছোট অঙ্কের অর্থ উপার্জন করেন তারা। আর দশ জনের মতো তাদের উপার্জিত অর্থ নিজেদের জন্য ব্যয় না করে, ব্যয় করছেন ১৬ লাখ মানুষকে নিয়ে তাদের স্বপ্ন পূরণের উদ্যোগের পিছনে। এই ৩ জন তরুণের প্রত্যেকের স্বপ্নের মাঝে এক দারুণ মিল। ১৬ লাখ মানুষকে ঘিরে তাদের সেই স্বপ্ন। বাংলাদেশের ১৬ লাখ মানুষের মাঝে প্রোগ্রামিং জ্ঞান পৌঁছে দিতে এই তরুণেরা উদ্যোগ নিয়েছেন। অল্পকিছুদিনের ব্যবধানেই স্বপ্নপূরণের পথে ৫৯৩ সংখ্যাটা পার করেছেন। 

10563367_669371329807001_2021754740_nপ্রযুক্তির প্রাণভোমরাই হলো প্রোগ্রামিং। অনেকেরই এই প্রোগ্রামিং শব্দটি শুনলেই চোখে ভেসে উঠে একটা কম্পিউটার মনিটর, তার সামনে বসা কোন এক এলিয়েনগোছের মানুষ, যিনি কিনা সাঁই সাঁই করে কীবোর্ড চেপে যান আর হাবিজাবি লেখায় মনিটর ভরে যেতে থাকে। প্রোগ্রামিং শব্দটা যতই গম্ভীর বা রাশভারি শুনাক না কেন, এর ভেতরটা ঠিক ততটাই মজার। এই প্রোগ্রামিং শেখাকে আরো আনন্দদায়ক,আরো সহজবোধ্য করে শেখার উপযোগী করতে কাজ শুরু করেছে “ইচ্ছে কোড স্কুল-বাংলা ভাষায় প্রোগ্রামিং শিক্ষা”।

 

বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎকৌশল এবং যন্ত্রকৌশল বিভাগের এই ৩ তরুণের উদ্যোগ ইচ্ছেকোড। বর্তমানে দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রধান হাতিয়ার আইটি সেক্টর- এই সত্য উপলব্ধি করেই অনলাইনে সবার জন্য বাংলা ভাষায় প্রোগ্রামিং শিক্ষাদানের এই প্রয়াস বেঁছে নেন তারা। প্রোগ্রামিং ভাষা যেমনঃ সি, সি++,পাইথন, জাভা, ম্যাটল্যাব, ওয়েব ডিজাইন ইত্যাদি সহজেই বাংলায় শিখাতে পারা যাবে ইচ্ছেকোডের ওয়েবসাইট থেকে। ওয়েবসাইটের ঠিকানাঃ www.icchecode.com ।

 

অনলাইনে প্রোগ্রামিং শিক্ষার পাশাপাশি ইচ্ছেকোডের উদ্যোগে পরিচালিত হয় ‘ইচ্ছে কোড প্রোগ্রামিং ক্যাম্প’। এই তরুণদের ইচ্ছা এই প্রোগ্রামিং ক্যাম্পের মাধ্যমে স্কুল এবং কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের ছোট বেলা থেকেই IT Expert, Software Developer, Programmer হিসেবে তৈরি করা। এরই মধ্যে গত ৭ইমে, ২০১৪ ইং ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি স্কুল এ্যান্ড কলেজ এবং ২৮ জুন, ২০১৪ ইং তেজগাঁও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, ঢাকা – এ প্রভাতী ও দিবার জন্য ইচ্ছেকোডের আলাদা দুইটি ক্যাম্প একই দিনে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

 

10559277_669371593140308_863865792_n

বাংলাদেশের একমাত্র টেকনোলজী রিভিউ প্লাটফর্ম, বুয়েটেক ডট কম (www.buetech.com) -কে দেয়া সাক্ষাৎকারে উদ্যোক্তারা বলেন, “পৃথিবীর অনান্য দেশে স্কুল কলেজ পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীরা প্রতিনিয়ত অনেক নিত্যনতুন সফটওয়্যার তৈরি করছে যা তাদের দৈনন্দিন জীবন ধারাকে পরিবর্তন করে দিচ্ছে। অথচ বাংলাদেশের বেশিরভাগ স্কুল কলেজ পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীরা জানতেই পারছে না কম্পিউটার প্রোগ্রামিং কি। আবার অনান্য দেশে স্কুল কলেজ পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীরা যেখানে ইনফরম্যাটিক্স অলেম্পিয়াডে অংশগ্রহণ করে ভালো ফলাফল করছে, আমাদের দেশের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীদের এ বিষয়ে তেমন কোনো ধারণাই নেই। যেহেতু অনান্য দেশে প্রোগ্রামিং ধারণা ছোটবেলা থেকে গড়ে ওঠে,তাই আমরাই বা কেন পিছিয়ে থাকব? আমাদের দেশে স্কুল কলেজে অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থী রয়েছে। তাদেরকে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং-এ সচেতন ও উৎসাহী করে তুলতেই আমাদের ‘ইচ্ছে কোড’ প্রোগ্রামিং ক্যাম্প।” স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রোগ্রামিং ধারণার সাথে পাঠ্য সিলেবাসের উপর ভিত্তি করে নানান প্রোগ্রামিং টপিকের উপর সুখপাঠ্য বইও বানাচ্ছেন তারা।

 

ভবিষ্যত পরিকল্পনার কথা বলতে গিয়ে উদ্যোক্তারা জানান, ” আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য ‘ইচ্ছে কোড’-এ অনেক স্বেচ্ছাসেবক তৈরি করা যাতে আমরা সারা দেশে স্কুল কলেজ পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের মাঝে প্রোগ্রামিং জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে পারি। আমরা কর্মক্ষেত্রে যেখানেই যুক্ত হই সারাজীবন ইচ্ছে কোড এর সাথে যুক্ত থাকতে চাই। আমাদের ‘ইচ্ছেকোড বিশ্ববিদ্যালয়’ নিয়েও পরিকল্পনা আছে, যেখানে কম খরচে দেশের যেকোন প্রান্তের শিক্ষার্থী উচ্চমানের প্রযুক্তি জ্ঞান লাভ করতে পারবে। ইচ্ছে কোড ইন্সটিটিউট তৈরি করতে চাই যেখানে কম খরচে প্রযুক্তি সম্পর্কিত বিভিন্ন কোর্স করা যাবে, যেমন বেসিক প্রোগ্রামিং শেখা, ওয়েব ডিজাইনিং, ওয়েব অ্যাপ, ডাটাবেজ, মোবাইল অ্যাপ, রোবোটিক্স। যারা এখান থেকে শিক্ষাগ্রহণ করবে তারাই পরবর্তীদের শেখানোর জন্য তৈরি হবে, এভাবে এই প্রযুক্তির পথে সেবামূলক প্রক্রিয়াটি চলতে থাকবে।” আই.সি.টি. মন্ত্রনালয় থেকে তাদের এই উদ্যোগ সরকারের গোচরে আনা হয়েছে, সাধুবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন মহল। প্রশাসনিক জটিলতার কারণে নানান মহলের সহযোগিতার আশ্বাস পেলেও সেসব উদ্যোগের বাস্তবায়ন একপ্রকার থেমেই আছে বলতে হয়।

 

এরই মধ্যে দেশের নানান গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে ইচ্ছেকোডের কথা। মানুষের নজর কেড়েছে ফয়সাল, আসিফ এবং রাজনের এই উদ্যোগ। তবে আর্থিক সহ নানান সমস্যার কারণে কাজ করতে প্রতিনিয়ত বেগ পেতে হচ্ছে এই তরুণ উদ্যোক্তাদের। সরকারের সহযোগিতা পেলে হয়তো ১৬ লাখ মানুষকে নিয়ে এই প্রযুক্তির পথযাত্রা অব্যাহত রাখাটা আরও সহজ হবে তাদের জন্য। ইচ্ছেকোডের উদ্যোক্তারা তাদের জীবনের পুরো অংশটা ব্যয় করার প্রত্যয়ে নেমেছে এই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে। নানাভাবে এই মেধাবী তরুণদের পাশে থেকে এই ইচ্ছেপূরণের সুযোগ করে দেয়ার দায়িত্ব বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের।

Share Button

1 Comment

1 Trackback / Pingback

  1. ৩ তরুণের ১৬ লাখ স্বপ্নকথাঃ ‘ইচ্ছেকোড’!

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*