বুয়েট শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনঃ স্বল্প খরচে সার প্রয়োগের যন্ত্র

লেভেল-৩, টার্ম-২ এর শুরুর দিকের কথা। প্রোডাক্ট ডিজাইন ল্যাবের জন্য প্রোজেক্টের আইডিয়া দরকার। অন্য সব গ্রুপের মত আমরাও ৩ টা আইডিয়া জমা দিলাম। তার মধ্যে স্যাররা একটা ঠিক করে দিবেন। সেটা নিয়েই কাজ করা লাগবে। কিন্তু সব গ্রুপের আইডিয়া ঠিক হয়ে গেল, কিন্তু স্যাররা আমাদের গ্রুপের আইডিয়া ঠিক করে দিলেন না , কারন আমাদের আইডিয়া গুলো সব ছিল ইলেকট্রিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ডের। যেহেতু আমরা ছিলাম ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোডাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের, সেই জন্য স্যার চাচ্ছিলেন মেকানিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ডের প্রোজেক্ট আইডিয়া। তার সাথে বললেন যে তোমরা দেখো কৃষির উন্নয়নে নিয়ে কিছু করতে পার কিনা।

শুরু হয়ে গেল নতুন আইডিয়া খোঁজাখুঁজি। আমাদের গ্রুপের সদস্যদের সকলেরই কৃষি কাজ সম্পর্কে ভাল ধারণা ছিল। কারন প্রায় সবারই গ্রামে বাড়ি ছিল। সবাই মিলে ভেবে দেখলাম যে, সাধারণত কৃষকরা জমিতে হাত দিয়ে ছিটিয়ে ইউরিয়া দিয়ে থাকেন। এভাবে ইউরিয়া প্রয়োগ যেমন কষ্ট সাধ্য তেমনি ইউরিয়ার অপচয়ও হয়ে থাকে। তাছাড়া গুটি ইউরিয়া দেওয়ার জন্য কৃষকদের আরো অনেক বেশি কষ্ট করতে হয়। এজন্য তাদেরকে প্রত্যেকটা গাছের কাছে গিয়ে ইউরিয়া দিতে হয়। বাইরের দেশে ইউরিয়া প্রয়োগের জন্য কিছু যন্ত্র পাওয়া গেলেও সেগুলো কোনটাই গুটি ও দানাদার ইউরিয়া এক সাথে দিতে পারে না। তাছাড়া সেগুলোর কর্ম পদ্ধতিও বেশ জটিল এবং দামও অনেক বেশি। সেই জন্য আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত এই সব যন্ত্র তেমন ভাবে চালু হয় নি।

তাই আমরা ইউরিয়া প্রয়োগের কষ্ট লাঘবের জন্য ভাবতে থাকলাম। অবশেষে আমাদের মাথায় যে যন্ত্রটির কথা আসলো সেটা দিয়ে দুই ধরনের ইউরিয়া দেয়া সম্ভব ছিল। যন্ত্রটির আরও বিশেষত্ব হচ্ছে যে কৃষক তার ইচ্ছামত গুড়া ইউরিয়ার প্রবাহ মাত্রা (flow rate) এবং গুটি ইউরিয়ার দূরত্ব পরিবর্তন করতে পারবেন যা বর্তমানের কোন যন্ত্র দিয়া করা সম্ভব না।

বেভেল গিয়ার (এক প্রকার দাঁতওয়ালা পার্টস যা গতিকে ৯০ ডিগ্রি কোণে রূপান্তর করে) ও অপসারনযোগ্য ডিস্ক ব্যবহার করার মাধ্যমে ব্যাপারটি সম্ভব হবে বলে আমরা খুজে বের করি। পরদিন স্যারকে বললে এটাই আমাদের প্রোজেক্ট আইডিয়া হিসেবে ঠিক হয়ে যায়।

1
বেভেল গীয়ার

এরপর শুরু হয়ে যায় সম্পূর্ণ প্রোডাক্টটা দাড় করানর জন্য দৌড়ঝাঁপ। আমরা সবাই মিলে আমাদের মেশিন শপ এবং ওয়েল্ডিং শপ এ প্রায় প্রত্যেক দিন পালাক্রমে কাজ করতাম। কিন্তু বেভেল গিয়ার বানাতে যেয়ে খুব ঝামেলা পোহাতে হয়। কারন বেভেল গিয়ার বানানোর প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমাদের ল্যাবে ছিল না। শুধু এই গিয়ারটাই ধোলাইখাল থেকে আমরা কিনে আনি। প্রায় ৩-৪ মাস পরিশ্রমের পর আমরা আমাদের প্রোডাক্টটা দাড় করাতে পারি।

যন্ত্রটির বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমুহঃ

 তিন-চার ফুট লম্বা হাতল দিয়ে যন্ত্রটিকে কাদা মাটির উপর দিয়ে টেনে নিয়ে গেলেই এর নিচ দিয়ে ইউরিয়া জমির ২-৩ ইঞ্ছি নিচে প্রবেশ করবে। ফলে সারের অপচয় শূন্যের কৌঠায় পৌছাবে।

 যন্ত্রটি একবার টেনে নিলেই দুই সারি ইউরিয়া প্রয়োগ হয়ে যাবে । ফলে কৃষকের সময় ও কষ্ট লাঘব হবে।

 কাদার উপর দিয়ে সহজে যাতায়াত এর জন্য চাকা ব্যবহার না করে স্লাইডার ব্যাবহার করা হয়েছে যাতে কৃষকগণ কম বল প্রয়োগ করেই যন্ত্রটি টেনে নিতে পারেন।

 যন্ত্রটির গঠনকৌশল সহজ ও বেশীর ভাগ অংশই অপসারণযোগ্য বলে কৃষক নিজেই এর রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারবেন খুব সহজেই।

 ঘূর্নায়মান ডিস্ক পরিবর্তন করে গুটি থেকে গূঁড়া যেকোন সাইজের ইউরিয়া দেয়া সম্ভব।

 গিয়ারের দাঁত সংখ্যা সমন্বয় করে সারের প্রবাহ মাত্রা নিয়ন্ত্রন করা যাবে। হস্তচালিত বলে ক্রয়ের সময়ের অর্থ ব্যাতীত আর কোন খরচই লাগবে না।

•  আমাদের উদ্ভাবিত যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষেতে নীড়ানির কাজটিও করা সম্ভব।

যন্ত্রটির বর্ননা ও কর্মপধতিঃ

যন্ত্রটিকে যখন কাদা মাটির উপর দিয়ে টেনে নেয়া হবে তখন Spike বা প্রবর্ধনযুক্ত বড় একটি চাকা কাদার সাথে লেগে লেগে ঘুরবে। এই চাকার কেন্দ্রের সাথে দুদিকে যুক্ত আছে দুটি দন্ড বা শ্যাফট। ফলে চাকা ঘুরলে এরাও ঘুরবে। এই দন্ড গুলোর অপর প্রান্তে লম্বভাবে লাগানো আছে একটি করে দুদিকে দুটি অপক্ষাকৃত সরু দন্ড। সরু দন্ড ও প্রধান দন্ডের সংযোগস্থলে থাকবে দুটি বেভেল গিয়ার। এই বেভেল গিয়ারই প্রধান দন্ডের ঘূর্ননকে সরু দন্ডে ৯০ ডিগ্রি কোণে স্থানান্তর করবে এবং একই সাথে ঘূর্নন সংখ্যা বৃদ্ধি করবে । সরু দন্ডের অপর প্রান্তে থাকবে একটি এক ছিদ্রওয়ালা ডিস্ক । ডিস্কসহ প্রতিটি সরু দন্ড বসানো থাকবে ইউরিয়া রাখার একটি বক্স এর ভিতর । ফলে যখন দন্ডটি ঘুরবে এই ডিস্কটিও এর উপরে ইউরিয়া নিয়ে ঘুরবে।

2

ইউরিয়া বক্সে তলার অংশে থাকবে অপর একটি ডিস্ক যেটিতে নির্দিষ্ট দূরত্বে থাকবে চারটি ছিদ্র। ফলে একছিদ্রওয়ালা ডিস্কটি চার ছিদ্রওয়ালা ডিস্ক এর উপর ঘুরতে থাকবে। এ কারনে যখনই উপরের ডিস্কের ছিদ্রটি নিচের ডিস্কের যেকোন একটি ছিদ্রের বরাবর আসবে তখনই একটি গুটি ইউরিয়া কিংবা কিছু পরিমান গূঁড়া ইউরিয়া বক্সের নিচে লাগানো পাইপ এর মধ্য দিয়ে কাদার ভিতর পড়বে । ইউরিয়া বক্স ও সমগ্র ফ্রেম বসানো থাকবে দু পাশে দুটি স্লিপারের উপর । স্লিপারের কাজ হচ্ছে যন্ত্রটিকে কাদার উপর দিয়ে সহজে নিয়ে যাওয়া ও ইউরিয়াকে মাটির ২-৩ ইঞ্ছি গভীরে পৌছে দিয়ে আবার মাটি চাপা দিয়ে দেয়া । এ জন্য যেদিক দিয়ে ইউরিয়া পড়বে সেদিকে স্লিপারে নিচে একটি ছোট্ট বক্স আছে যেটি মাটিকে ২-৩ ইঞ্চি গভীর করে এর ভিতরে ইউরিয়া ফেলে দেয় ।

যেভাবে ইউরিয়ার প্রবাহ নিয়ন্ত্রন করা যায়:

চাকা সহ প্রধান দন্ডটি বিয়ারিং দিয়ে ফ্রেমের সাথে নাট-বোল্ট দিয়ে যুক্ত থাকে। যার ফলে এটি ইচ্ছা করলেই খুলা বা লাগানো যায়।আবার একছিদ্রওয়ালা ডিস্ক ও সরু দন্ডটিও অপসারনযোগ্য । এ জন্য প্রয়োজন মতো যেকোন সাইজের ছিদ্রযুক্ত ডিস্ক লাগানো যাবে । আবার গিয়ারও যেহেতু খোলা যায় ফলে ভিন্ন ভিন্ন দাঁত সংখ্যা বিশিষ্ট্য গিয়ার লাগিয়ে ঘূর্নন সংখ্যা বাড়ানো বা কমানো যায় । এভাবে জমিতে বিভিন্ন সাইজের ইউরিয়া প্রয়োজন মতো নির্দিষ্ট হারে ফেলা সম্ভব ।

একইভাবে এই যন্ত্রটি দিয়ে জমিতে বীজ বপন এবং অপসারণযোগ্য ব্লেড সংযোজন করে আগাছা পরিষ্কার করাও সম্ভব।

আমাদের যন্ত্রটি বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আসলে এর ক্রয়খরচ পড়তে পারে ৫-৬ হাজার কিংবা তার চেয়েও কম।

কৃষিপ্রধান দেশ হওয়াতে আমাদের সকলের উচিত কৃষির উন্নতিতে অবদান রাখা। কৃষকগন অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন নিরন্তুর। তাদের কিছু কষ্ট লাঘবে সহায়ক হলেও আমাদের এই প্রচেষ্টা সফল হয়েছে বলে আমরা মনে করবো । তাই সরকার কিংবা কোন প্রতিষ্ঠান এ যন্ত্রটির বাণিজ্যিকীকরন করে কৃষকদের হাতে পৌঁছে দিবে এ আশা আমাদের সকলের ।

cn

এ যন্ত্রটির আইডিয়া, ডিজাইন ও বাস্তবায়নে-

মীর কামরুজ্জামান কবির,
ফিরোজ কবির ,
মো. আনিসুর রহমান,
তানজীদ হাসনাইন এবং
সিওন সালেহীন।

 

(শিক্ষার্থীদের প্রত্যেকেই বুয়েটের ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোডাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের ছাত্র।)

তথ্য ও যোগাযোগঃ

[email protected]
অথবা
০১৯১৫-০০৭৫৭৬

Share Button

3 Comments

  1. বিষয়টা জেনে ভাল লাগছে। আশা করছি দিন দিন আমাদের দেশের উদ্ভাবকেরা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেবে। শুভকামনা জানাচ্ছি।

    • নিজের উপরে বিশ্বাস রাখুন, বিজ্ঞান এবং গণিতের বিষয়গুলো ভালভাবে বুঝে পড়ার চেষ্টা করুন। বুয়েটে আসতে পারা এমন কোন কঠিন ব্যাপার হবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*