নোবেলজয়ীদের সাথে একটি রোদেলা সকাল!

বিস্মিত আমার মনের পর্দায় বারবার ভেসে উঠছে ছবিগুলো!

ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে আমি জানলার পাশে দাঁড়িয়েছি। সবুজ অরণ্য ঘেরা পাহাড়ের মাঝখানে সুদৃশ্য একটা লেক এর উপর সূর্যের আলো এসে পড়েছে- এই দৃশ্য মুগ্ধ হয়ে দেখছি। এই দৃশ্যের পরে আমার যেটা মনে পড়ছে সেটা হল, একটা বিশাল সন্মেলন কক্ষে তেইশ জন নোবেল লরিয়েট এবং সারা বিশ্ব থেকে আসা ছশো ন’ জন তরুণ গবেষকের সঙ্গে আমিও আছি!

তরুণ গবেষক এবং নোবেল লরিয়েট দের মধ্যে জ্ঞানের আদান প্রদানের জন্য বৈশ্বিক ভাবে স্বীকৃত এই ‘লিন্ডাও নোবেল লরিয়েট সন্মেলন’ ১৯৫১ সাল থেকেই হয়ে আসছে। এই সন্মেলনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট হল- মানুষে মানুষে ভাব আদান প্রদান করাকে এখানে কাগুজে কচকচি’র চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়! এই সন্মেলনে বিজ্ঞান গবেষণায় আগ্রহী তরুণ প্রজন্ম কে অনুপ্রাণিত করা হয় এবং বিশ্বজোড়া তরুণ গবেষক দের একটা শক্তিশালী নেটওয়ার্ক এর মাধ্যমে তৈরি হয়। নোবেল লরিয়েট রা সেখানে আনুষ্ঠানিক বক্তৃতা দেন, আবার একেবারে অনানুষ্ঠানিক ভঙ্গিতে তরুণ গবেষক দের সাথে আড্ডা দেন। এই আড্ডা তরুণ গবেষক দের শুধু অনেক কিছু শেখায় বা অনুপ্রাণিতই করে না, নোবেল লরিয়েট দের সাথে তাদের এক ধরনের বন্ধন ও তৈরি করে।

২০০৯ সালের সন্মেলন টা ছিল কেমিস্ট্রি বিষয়ে। পাঠ্যবই আর ‘কেমিস্ট্রি সেলেব(!)’ ওয়েব সাইটে এতদিন যাদের দেখেছি তাদের সামনাসামনি দেখব!- এই স্বপ্নই আমাকে বাংলাদেশ লিণ্ডাও কাউন্সিল এর মাধ্যমে এই সন্মেলনে যোগদানের আবেদন করতে উদ্দীপ্ত করল। অনেক অনিশ্চয়তার দোলাচলের মাঝখানে থেকে একদিন লিণ্ডাও কাউন্সিল এর ইমেইল পেলাম। তারা আমাকে প্রাথমিক ভাবে মনোনীত করেছে এবং চূড়ান্ত অনুমোদন করাটা সময়ের ব্যাপার মাত্র!
কিন্তু কিসের কি! সময় পার হয়ে যায়, কোন ইমেইল আসে না। এক পর্যায়ে যখন আমি আশা ছেড়ে দিলাম তখন দেখি লিণ্ডাও কাউন্সিল এর ইমেইল এসে হাজির! নোবেল লরিয়েট সন্মেলনে যোগদানের চূড়ান্ত অনুমোদনপত্র পেয়ে গিয়েছি। সকাল বেলা নোবেল পুরস্কার পাবার টেলিফোন পেয়ে ঘুম ভাঙলে নোবেল লরিয়েট দের মনের যে অবস্থা হয় এই তড়িৎ চিঠি পেয়ে আমার মনের অবস্থাও হয়েছিল সেই রকম।

২০০৯ সালে বাংলাদেশ থেকে আমি সহ মোট তিনজন এই সন্মেলনে যোগ দানের সুযোগ পেয়েছিলাম। আমার অভিজ্ঞতা বলতে কিছুই ছিলনা, কিন্তু বৈজ্ঞানিক চেতনা সম্পন্ন মানুষের সাথে আমি একধরনের মানসিক যোগাযোগ অনুভব করি, সেই চেতনার অংশ বিশেষ আমার মনের আয়নায় প্রতিফলিত হয়, আর সেটাই আমাকে অসম্ভব অনুপ্রেরণা দেয় বৈজ্ঞানিক কর্মকান্ডের সাথে নিজেকে যুক্ত করার- নিজের সম্পর্কে এই টুক আমি বলতে পারি। এই অনুভবটাই হয়ত ভবিষ্যতে আমার নিজের গবেষণাকাজ কে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

সেদিন লিণ্ডাও সন্মেলনের সূচনা করেন ২০০৭ সালের অন্যতম নোবেল বিজয়ী জার্মান পদার্থবিদ গেরহার্ড আর্টল। তিনি তরুণ বৈজ্ঞানিক দের তাদের কৌতূহল কে অনুসরণ করার পরামর্শ দেন, এতে ব্যর্থতার সম্ভাবনা থাকলেও! উনি বলেন- গবেষকের বিরাট সুবিধা হচ্ছে ভুল করার অনুমতি তাকে দেয়া আছে! কাজেই অন্যে কি বলছে সেটা বিশ্বাস না করে নিজের মত করে কোন জিনিষের মূল অনুসন্ধান করা উচিত।

যারা মনে করেন বিজ্ঞানের রসকষহীন বিষয়ের বাইরে নোবেল লরিয়েট দের কোন আগ্রহ নাই, যারা একটিবারও ভেবেছেন, বস্তগত বিষয়ের বাইরে বৈজ্ঞানিক রা চিন্তা করতে পারেন না, তাদের সেদিন এর লিন্ডাও সন্মেলনের সেই মুহুর্তটিতে উপস্থিত থাকা উচিৎ ছিল যে মুহুর্তে ১৯৯১ সালের নোবেল বিজয়ী ‘রিচার্ড আর আরনেস্ট’ তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে পুরা সন্মেলনের আবহটাকে বস্তগত বিজ্ঞানের স্থূল সীমানার বাইরে নিয়ে গেলেন। আমরা আরনেস্ট কে দেখলাম শুধুই একজন বিজ্ঞানী হিসেবে নয়। বরং তার চেয়ে অধিক কিছু, একজন দার্শনিক হিসাবে।

‘কৌতূহল এবং সৃষ্টিশীলতা- খুব গুরুত্বপূর্ন! প্রকৃতিগত ভাবেই একজন থেকে আরেকজনের মাঝে ছড়িয়ে যায়। নতুন আবিষ্কার এবং বিস্ময়ের জন্য বিশ্ব সবসময় অপেক্ষা করছে! একমাত্র উপদেশ হল- চোখ এবং কান খোলা রাখ, একপেশে জন্ততে পরিণত হয়ো না। তোমার ভাল লাগাকে কখনো বিস্মৃত হয়ো না। ভালোলাগা এবং পেশা পরস্পরের পরিপূরক!’- আরনেস্ট এর কথা।

বৈজ্ঞানিক এবং মানবিক চেতনাবোধের অপূর্ব সমন্বয় সেদিন আরনেস্ট এর বক্তৃতায় আমি দেখেছিলাম। তাঁর বক্তব্যের মূল বার্তা ছিল- সম্পূর্ন এবং সবদিকে ভারসাম্যপূর্ন ব্যক্তিতে পরিণত হও। একজনের উচিত বিজ্ঞানের সীমারেখার বাইরে গিয়েও শিল্প এবং মানবিকতার দৃষ্টি দিয়ে জীবন কে অনুসন্ধান করা।

এই মহান দার্শনিকের সাথে কিছু সময় কাটানোর সুযোগ আমি মোটেও নষ্ট করতে চাই নি। উনার চেহারার হাসি হাসি দার্শনিক মুডটাও আমাকে আলাপ করার সাহস দিল। উনার সাথে দীর্ঘ আলাপের পর আমি যে বার্তাটা পেলাম সেটা হল- একজন ভাল বৈজ্ঞানিক হবার চেয়ে একজন ভাল মানুষ হওয়াটা অনেক বেশি জরুরী!

"কাজী মাহমুদা তাসনীম মিম্মি'র লেখা In the light of Noble experience পড়ে অসম্ভব ভাল লাগল। এত ঝরঝরে ইংরেজিতে লেখা যে আমার মত নাদান, না-ইংলিশ লোক পর্যন্ত পড়ে অনেক কিছু বুঝে ফেললাম। মিম্মির অনুমতি নিয়ে সাহস করে এই লেখার প্রথম অংশের ভাবানুবাদ করে ফেললাম। আগে দেখি লোকজন কি বলে! পরিস্থিতি অনুকূল হলে পরের অংশটুকু ও অনুবাদ করব।" - মহীউদ্দিন খালেদ।

অনুবাদকঃ
মহীউদ্দিন খালেদ, যন্ত্র প্রকৌশলী এবং লেখক।

তথ্যসূত্রঃ
Mimmi, K.M.T., In the Light of a Noble Experience, ChE Thoughts 1 (1), 14-16, 2010.
Mohidus Samad Khan, Editor at Che Thoughts.

Share Button

1 Comment

  1. লিন্ডাউ-এ যেতে ইচ্ছুকরা এখানে যোগাযোগ করুনঃ

    http://lindau-bangladesh.org/

    Each year, since 1951, 20 to 25 Nobel Prize Winners accept the invitation to a unique meeting on Lake Constance. Some 500 young students come from all over the world to listen to the Laureates’ lectures and to engage in discussions with them. Intermediaries from universities and research institutions select participants based on strict criteria. Started in 2004, there is an addition to the traditional Lindau Meetings for Nobel Prize Winners in Natural Sciences. Since then the Meeting of Prize Winners in Economic Sciences takes place every two years.

    The Lindau Council is interested in bringing young Bangladeshi talents into the Lindau dialogue and through it establish a relation in order to foster their vision of Lindau as a window to the world. Lindau Council would like to reach out to the young Bangladeshi’s, who study/work in or out of their homeland and to give them the possibility of joining forthcoming Lindau meetings।

    Interested applicants from related area can apply for the Upcoming Lindau Meeting.

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*