বাঁশকেলঃ বাঁশের তৈরী বাইসাইকেল

যানজটের শহর ঢাকাতে চলাচলের সঙ্গী হিসেবে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে সাইকেল। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সাইকেল আছে বাজারে। এরই মধ্যে বাংলাদেশের তৈরী সাইকেল এখন বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। কিন্তু অধিকাংশের ফ্রেমই লোহা এবং লোহার সংকর অথবা কার্বন ফাইবার দিয়ে তৈরি।

বাংলাদেশের কিছু তরুণ এই ফ্রেম নির্মাণ করছেন অভিনব পদ্ধতিতে- বাঁশ ব্যবহার করে। বুয়েটেকের পক্ষ থেকে কথা হ’ল তাদের তৈরী সাইকেলের ফ্রেম নিয়ে। নির্মাতাদের একজন সজীব বর্মণ, পড়ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা,পানি ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগে। আরেকজন সানজিদুল ইসলাম ইমন, পড়ছেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির বিবিএ তে।

বাঁশের সাইকেল এর ধারণা নতুন নয়। ১৮৯৪ সালে প্রথম বাঁশের সাইকেল প্রদর্শিত হয়। সম্প্রতি (২০১৩ সাল) জার্মানির বার্লিন-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ওজোন সাইক্লেরি’র নকশাকার ড্যান ভোগেল-এসেক্স ও স্টেফান ব্রুনিং তৈরি করেছিলেন বাঁশের সাইকেল। বাঁশের তৈরি বাইসাইকেলের মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি পরিবেশ বান্ধব, অনেক ধাতুর তুলনায় এর সহন ক্ষমতা অপেক্ষাকৃত বেশি এবং দামের দিক থেকে অনেক সাশ্রয়ী।প্রথম চিন্তায় অনেকেই বাঁশ ব্যবহারে দ্বিমত করতে পারেন। কিন্তু প্রাকৃতিক কম্পোজিট হিসেবে বিভিন্ন বিজ্ঞানীরা বাঁশকেই প্রথম পছন্দ হিসেবে গ্রহণ করে থাকেন।

এ ধরণের বাঁশের তৈরী কাঠামোর বিশেষ বৈশিষ্ট্য এবং সুবিধাগুলো হচ্ছে-

  • পরিবেশ বান্ধব।
  • বাঁশ দিয়ে তৈরি করা ফ্রেম তাপ সহনশীল।
  • এসব ফ্রেমের ওজন মাত্র ১ কেজি থেকে ২ কেজি পর্যন্ত করা সম্ভব।
  • একই ভরের লোহার তুলনায় বাঁশ অধিক ভার বহনে সক্ষম।
  • ১০ বছর পর্যন্ত ওয়ারেন্টি দেয়া সম্ভব।
  • টায়ার ক্লিয়ারেন্স, ব্রেকের ধরন এবং আনুষঙ্গিক নানান এক্সেসরিস ইন্টিগ্রেশন সম্ভব।
  • সবচেয়ে ক্র্যাশ সহনশীল ফ্রেম।
  • অধিকাংশ প্রকারের কার্বন ফ্রেমের থেকেও অধিক শক্ত।

শুরুটা হয়েছিল ২০১২ সালে। সজীব অসুস্থ হয়ে ঘরে বসে অলস সময় পার করছেন। মাথায় চিন্তা এলো ভিন্ন কিছু করার। শুরু করলেন বাঁশের সাইকেলের ফ্রেমের ডিজাইন। প্রথমেই সমস্যা দেখা দিলো কোন প্রজাতির বাঁশ ব্যাবহার করবেন সেটা নিয়ে। এই ব্যাপারে তাকে সহযোগিতা করলেন কাঁটাবন ভূমি অফিসের ডঃ খাইরুল ইসলাম। এরপর বাঁশের প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ শুরু। বাঁশকে টেকসই করতে ২-৩ দিন পানিতে রেখে তারপর তাপ দেয়া হল।

Bike FrameBike Frame

প্রথম সাইকেলটা তৈরি করা হয় ২০ দিনে, একটা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য। ২০১৪ সালে আয়োজিত “DCCI Entrepreneurship Innovation Expo” নামের প্রতিযোগিতায় সকলের নজর কাড়ে এই সাইকেল। কিন্তু সজীব বাইরের কোন আর্থিক সহযোগিতা গ্রহণ করেননি কাজের স্বাধীনতা হারানোর ভয়ে। এরপরের সাইকেলটির ফ্রেম তৈরি করেছেন অনেক সময় নিয়ে, প্রায় ৫ মাস ধরে। তারপরও কিছু সমস্যা রয়ে গেছে ফ্রেমে। এখন কাজ করছেন এই সমস্যাগুলো দূর করার লক্ষ্য নিয়ে।

কাজ করতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি অভাব অনুভব করেছেন টাকা আর ভালো একটা ল্যাব-এর । এতদূর আসার পরও এখনও পর্যন্ত ইমনের বাড়ির বারান্দাতেই চলছে কাজ।

বুয়েটেকের সাথে আলোচনায় জানালেন তাদের মাপ-ঝোঁকের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবের কথা। কোন জিগ(কোন কিছুকে শক্তভাবে আটকানোর জন্য ব্যাবহার করা সরঞ্জাম) ছাড়াই হেড টিউব অ্যাঙ্গেল, সিট টিউব অ্যাঙ্গেল ঠিক করেছেন। একারণে হেড টিউব অ্যাঙ্গেলের চার ডিগ্রী কৌণিক বিচ্যুতি ঘটেছে। তবে নতুন যে ডিজাইন করছেন তাতে এই সমস্যা দূর করার চেষ্টা করবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

বাঁশ ছাড়া ফ্রেমের জয়েনিং এর জন্য তিনি রেজিন আর পাটের আঁশ ব্যাবহার করেছেন।

রেজিন এর জয়েন্ট কতটা মজবুত হবে এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “হেলিকপ্টারের পাখার ব্লেডও রেজিন দিয়ে মেরামত করার উদাহরণ আছে”। বাঁশের স্থায়িত্ব সম্পর্কে তিনি বলেন,  “বাঁশ লোহা বা লোহার সংকর থেকেও বেশি শক্তিশালী”।

নিজের ডিজাইন করা সাইকেল নিয়ে এরমধ্যে তিনি ৭০০ কিমি এরও বেশি ভ্রমণ করেছেন। বাজারে পাওয়া আর সব সাইকেলের মত এই ফ্রেমেও প্রয়োজনীয় এক্সেসরিজ সংযুক্ত করা যাবে বলে জানিয়েছেন।

সজীব তার পরবর্তী ফ্রেম তৈরি করতে চান ক্রস-কান্ট্রি সাইকেলের জন্য। এ সাইকেলে চড়েই সবগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে দেখতে চান তিনি।

বাঁশের সাইকেল নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে সজীব জানান, “আমার জীবনের লক্ষ্য একজন সুখী মানুষ হওয়া। আমি এই কাজটা করে আনন্দ পাই। যতদিন আনন্দ পাবো, ঠিক ততদিনই চালিয়ে যাবো”।

Share Button

2 Comments

  1. বাশকেল বাজারজাত করার কোন পরিকল্পনা আছে কি না তা হলে আমার মত প্রযুক্তি প্রেমিরা কিনে নিতে পারতো

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*