রোবোটাক্ষু!

Image processing বা ছবি বিশ্লেষণ জিনিসটা অনেকটা এরকম- ধরা যাক কোন একটা ছবি আছে আপনার কাছে। সেই ছবির রঙ, ধরণ, প্রকৃতি- এরকম সবগুলো গুণ যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে গবেষণা করে কোন একটা সিদ্ধান্ত নেয়া হল। হতে পারে সেই সিদ্ধান্তটা কোন পৃথক যন্ত্রকে সিগন্যাল দেয়ার মাধ্যমে কিংবা কোন প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে কাজে লাগানো হচ্ছে।

বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগে অধ্যয়নরত ৪ শিক্ষার্থী আমিনুল হক খালেদ ,আশিক আকিফ , মেহেদী হাসান এবং আব্দুল মুহাইমিন রহমান এর ইচ্ছা ছিল এই ইমেজ প্রসেসিং নিয়ে কিছু করার। ২০১২ সালে ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড প্রোজেক্ট শো তে ত্রিমাত্রিক ম্যাপিং এর একটা দারুণ রোবট ওদের চোখে পড়ার পর এই আগ্রহ বহুগুণে বেড়ে যায়। সাহসে কুলাচ্ছিল না তখন ওদের, মাত্র মাইক্রোকন্ট্রলার নামক জিনিসের সাথে পরিচিত হয়েছে যে। বুয়েটে ৩য় বর্ষে পদার্পন করার সাথে সাথে সিদ্ধান্ত চুড়ান্ত করে ফেলল- ওরা রোবট বানাবেই। সম্ভব হলে গবেষণা পত্রও বের করবে। CAD ডিজাইনে দারুণ পারদর্শী খালেদ ডিজাইন করে দাড় করিয়ে ফেলল রোবটের ডিজাইন। ইতিমধ্যে এন্ড্রয়েড ফোনের এপ্লিকেশন নিয়ে কাজ করা আকিফ ইলেকট্রনিক্সে দক্ষ মেহেদিকে নিয়ে নেমে পড়ল কাজে। খালেদের নিপুণ ডিজাইনের কারণে রোবটের কাঠামো তৈরী অনেক সহজ হয়ে যায় ওদের কাছে। আর আকিফের ছিল নিখুঁতভাবে কাজ করার মানসিকতা- কাঠামোর ছোটখাটো খুঁতগুলো সংশোধন করে ওটাকে চমৎকারভাবে তৈরী করা সম্ভব হয়।

এই ৪ জন মেধাবী শিক্ষার্থী এক বা একাধিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছেন। জিতেছেন পুরস্কার, পেয়েছেন স্বীকৃতি। এসব প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহন করে সবচেয়ে লাভবান হয়েছে বলে মনে করেন – “অনেকের কাছ থেকে আমাদের প্রজেক্টগুলো নিয়ে সাজেশন পেয়েছি। যা পরে অনেক কাজে দিবে ইনশাআল্লাহ।”

পরপর ৩ বার অংশগ্রহন করে কোন সফলতা না পেয়েও তারা হাল ছেড়ে দেননি। তারা ধৈর্য্য ধরে কাজ করে গেছেন।

‘উন্মাদ’ নামের এই দলের বানানোর রোবটার নাম ছিল “An Android Controlled Mobile Robot for Live Streaming and Stereo Vision with Robotic Arm”.

Bike FrameBike Frame

এই রোবটের মূল ৩টি ফিচার নিয়ে আলাদা আলাদা ভাবে প্রচুর কাজ হয়েছে আর হচ্ছে । মূল কাজ হলো কোন জায়গায় গিয়ে একটা ত্রিমাত্রিক ম্যাপ তৈরি করা । অর্থাৎ, রোবটটি কোন স্থানে গিয়ে সেই স্থানের প্রতিটা পয়েন্টে যেসকল বস্ত রয়েছে সেগুলোর আপেক্ষিক অবস্থান একটি ত্রিমাত্রিক লেখচিত্রে দেখানোর চেষ্টা করবে। একই সাথে সেটা সারভেইলেন্স রোবটের মতোও কাজ করবে। অর্থাৎ, দূর থেকে ছবিগুলো ওয়াইফাই কানেকশনের সাহায্যে সার্ভার কম্পিউটারে প্রেরণ করবে।

রোবটটাকে ম্যানুয়ালি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য দলের সদস্যরা একটি এন্ড্রয়েড এপ্লিকেশন বানিয়েছেন। যা মোবাইলের এক্সেলেরোমিটারের সাহায্যেও নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব। এই রোবটের চোখ হিসেবে মোবাইলের ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়েছে, যার উদ্দেশ্য ছিল মোবাইলে থাকা  WiFi কিংবা Bluetooth Communication system ব্যবহার করা। ওয়েব ক্যাম ব্যবহার করলে আরো ভালো হত , কিন্তু সেই ছবি গুলোকে সার্ভারে পাঠানোর জন্য বেশ কিছু হার্ডওয়ার নিয়ে কাজ করা লাগত, যা প্রজেক্টের জটিলতা বাড়াত। সময় স্বল্পতার কারণে দলের সদস্যগণ সেই দিকগুলো নিয়ে কাজ করতে পারেননি বলে জানালেন। একারণেই মোবাইলের ক্যামেরা দিয়ে কাজ চালাতে হয়েছে। ইমেজ প্রসেসিং এর জন্য ম্যাটল্যাব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেছেন তারা।

এই রোবটের মূল কাজ হচ্ছে কোন স্থানের ত্রিমাত্রিক ম্যাপ তৈরি করা। ত্রিমাত্রিক ম্যাপিং মূলত সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের সার্ভেয়িং এ বেশি কাজে লাগে।

অর্থাৎ , কোন স্থানের উঁচু-নিচু অংশগুলো বের করে দেখানো।

এছাড়াও কোন বস্তু বহনের ক্ষেত্রেও এটি কাজে লাগানো সম্ভব। পুরো প্রক্রিয়াটি দূর থেকে দেখা এবং নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব।

দলের সবাই তাদের এই সফলতার পিছনে তাদের পরিবারের সদস্যদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন। ইলেক্ট্রনিক্সের ব্যাপারে ভার্সিটির বেশ কিছু বড় ভাই এর কাছে কৃতজ্ঞ তারা। যন্ত্রকৌশল বিভাগের ২০০৮ ব্যাচের রাকিব ভাইয়ার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন তারা। তার কাছেই মাইক্রো কন্ট্রোলার ভালো ভাবে শেখা।

দলের সদস্যগণ মনে করেন, রোবটিক্স নিয়ে এদেশে ভালোই কাজ হচ্ছে। তবে কেন জানি লাইন ফলোয়ার, গ্রিড সল্ভার, ড্রোন নিয়েই বেশি কাজ করছে। তাদের মতে রোবটিক্স নিয়ে আরও সৃজনশীল কাজ হওয়া উচিত।

নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে তারা বলেন, রোবটিক্স এর কাজ গুলো হাতে কলমে না করলে শেখা সম্ভব না। যতই কোর্স করিনা কেন, অন্তত একটি রোবট নিজের হাতে বানানোর চেষ্ট করা উচিৎ। আর আবার যারা কাজ করেন, তাদের অনেকেরই একটা সীমাবদ্ধতা হচ্ছে – উনারা শুধুমাত্র বিভিন্ন প্রতিযোগিতার জন্য রোবট বানানোর চেষ্টা করেন। তাই অনেক কাজ জানা সত্ত্বেও তাদের দ্বারা লাইন ফলোয়িং রোবট ছাড়া আর কিছু বানানো হয়ে উঠে না। তাদের মতে, বিভিন্ন প্রোজেক্ট শো গুলোতেও নিয়মিত সকলের অংশগ্রহণ করার চেষ্টা করা উচিৎ।

এইসব উজ্জ্বল মুখগুলো স্বপ্ন দেখেন এদেশেই রোবটিক্স নিয়ে দারুণ কিছু করার। এই চমৎকার ক্ষেত্রটিকে নানাভাবে মানুষের উপকারে কাজে লাগানোর স্বপ্ন দেখেন প্রতিনিয়ত।

ভিডিও লিঙ্ক: https://www.youtube.com/watch?v=NC-7pa_w_Js

লেখা তৈরী করেছেন-
১. সুজয় তালুকদার, ৪র্থ বর্ষ, যন্ত্রকৌশল বিভাগ, বুয়েট।
২. সাজেদুর রহমান সাজু, ৩য় বর্ষ, পুরকৌশল বিভাগ, বুয়েট।

Share Button

5 Comments

  1. nice bro,dekhe onek valo laglo.soro korte hobe amader sobai ke,because Bangladesh poribortone amader sobai ke kaj korte hobe.love u all…

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*