সুজনের থ্রি-ডী মাউস!

মোঃ রেজওয়ানুল ইসলাম সুজন। ছেলেটা পড়ে সিভিলে। বুয়েটে, ৩য় বর্ষে। স্রোতের বিপরীতে চলার আহ্বানটা ছিল সেই ক্লাস ফোর থেকেই। প্রচন্ড ঝোঁক ছিল ইলেকট্রনিক্সের উপর তখন থেকেই। পরে তো ভর্তি হ’ল বুয়েটের পুরকৌশলে। সেখানে পড়াশোনা করে ইলেকট্রনিক্সের সাথে সিলেবাসের তেমন যোগাযোগ নেই বললেই চলে, তবে তার স্বপ্নের পথচলা থেমে যায়নি মোটেও। সে তার পছন্দের আর নেশার পিছনে গতি না কমিয়েই ছুটে চলেছে আজও। দারুণ মেধাবী এবং প্রচারবিমুখ এই ছেলেটি একের পর এক বানিয়ে চলেছে দারুণ দারুণ সব ইলেক্ট্রনিকস যন্ত্র, উদ্ভাবন করে চলেছে স্বল্পমূল্যের নানান কার্যকরী পদ্ধতি। আড়ালে থাকা এই মেধাবী মুখকে নিয়ে বুয়েটেকের আরেকটি প্রতিবেদন।

সুজন3D Mouse

ডিজাইনার, গেমারদের জন্য প্রচলিত Mouse (2D Mouse)-র সীমাবদ্ধতা বেশিরভাগ সময়ে অনেক বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সচরাচর ব্যবহার করা এসব মাউসের নানারকমের ঝামেলা এড়ানোর জন্য এবার বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের সুজন নিজেই বানিয়ে ফেলেছে 3D Mouse।

বর্তমানে আমরা যে সব ‘রিমোট কন্ট্রোলার’(যা ‘মাউস’ হিসেবে ব্যবহার করা যায় না) ব্যাবহার করি এগুলো লেজার কিংবা ইনফ্রা-রেড লাইট প্রযুক্তিতে কাজ করে।ফরওয়ার্ড, ব্যাক-ওয়ার্ড, চ্যানেল পরিবর্তন করা ছাড়া এগুলোতে তেমন কোন সুবিধা থাকে না। একটা মাউস যদি এরকম ‘রিমোট কন্ট্রোলার’-র মতো হ’ত? যদি হাতের মুঠোয় নিয়েই স্বাভাবিক মুভমেন্টের মাধ্যমেই মাউস কাজ করত!

ঠিক এরকমই একটি মাউস বানিয়েছে এবার বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের সুজন। এ ‘মাউস’-এ থাকছে সচরাচর মাউসের সবগুলো সুবিধা। পাশাপাশি বেশ কিছু আধুনিক প্রযুক্তি। পূর্বে যে মাউস আপনি কোন অবলম্বনের উপর রাখা ছাড়া ব্যাবহার করা সম্ভব ছিলনা সেটাই এখন চাইলেই টিভির রিমোটের মত করে ব্যাবহার করতে পারবেন।

সুজনের এই মাউস বানানোর পিছনে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে ‘লিপ মোশন’ নিয়ে বর্তমানের নানান প্রযুক্তি। ‘লিপ মোশনের’ বড় একটা সমস্যা হচ্ছে ঐটার পাল্লা- যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ১০ ফিট(৩মিঃ) এর বেশি নয়। আর সুজনের উদ্ভাবিত এই মাউসের পাল্লা ১০ মিটার।

এই কাজের পিছনে আরেকটি অনুপ্রেরণা হিসেবে সুজন উল্লেখ করলেন “ক্লাসে শিক্ষকদের বার বার পিছন থেকে ডেস্কটপের কাছে গিয়ে স্লাইড পরিবর্তন করা” করার ঘটনা।

সুজনের বানানো যন্ত্রটি মাইক্রোপ্রসেসর, ব্লুটুথ মডিউল, বাটন, জাইরোস্কোপিক সেন্সর, এক্সিলারোমিটার সেন্সর, এলসিডি ডিসপ্লে এবং মেমোরি স্টোরেজ নিয়ে গঠিত। জাইরোস্কোপ ‘ঘূর্ণন গতি’ কে সনাক্ত করতে পারে। অপরদিকে এক্সিলারোমিটার সেন্সর ‘ত্বরণ’ উপলব্ধি করতে পারে।

সাধারণত জাইরোস্কোপ ও এক্সিলারোমিটার থেকে প্রাপ্ত ডাটা বৈদ্যুতিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ (Noisy) হয়ে থাকে। মাইক্রোপ্রসেসরে সংরক্ষিত এলগরিদমের মাধ্যমে এই ডাটাকে ত্রুটিমুক্ত করা হয়েছে। বেশ দূরত্বে অবস্থিত ‘মাউস’ ও ‘সফটওয়্যার’ এর মধ্যে সংযোগ স্থাপন করার কাজে সুজন ব্যবহার করেছেন ব্লু-টুথ মডিউল।

‘জাইরোস্কোপ’ ও ‘এক্সিলারোমিটার’ থেকে প্রাপ্ত ঐ প্রাথমিক ডাটাকে ‘মোশন ফিউশন এলগরিদম’ এর মাধ্যমে নয়েজ বা বৈদ্যুতিক ত্রুটি মুক্ত করার কাজটা করে মাইক্রোপ্রসেসর। এরপর সেই ডাটাকে ‘ব্লুটুথ মডিউল’ এর মাধ্যমে পিসিতে ‘সফটওয়্যার’ এর কাছে প্রেরণ করে। এছাড়াও মাউসের নানা বাটন চাপার পর এর ইনপুট সিগন্যালগুলোকে প্রক্রিয়াজাত করে সফটওয়্যার এর কাছে প্রেরণ করার কাজটাও করছে মাইক্রোপ্রসেসর। এলসিডি ডিসপ্লের মাধ্যমে মাউসের নানান কাজ বিভিন্ন প্রদর্শন করা হয়েছে এই ডিভাইসে।

সুজনের উদ্ভাবিত এই মাউস ‘Gesture recognition algorithm’ বা ‘অভিব্যক্তি নির্ণয় পদ্ধতি’ সাপোর্ট করে। মেমোরি স্টোরেজ এই তথ্যগুলো সংরক্ষণ করে রাখে যা পরবর্তীতে নানা কাজে ব্যবহার করা হয়।

থ্রি-ডি মাউস প্রধানত ব্যবহার করা হয় ক্লাস বা সেমিনারে প্রেজেন্টেশনের সময়। বিভিন্ন ডিজাইন এবং সিমুলেশনের কাজেও এধরণের মাউস দারুণ সহযোগিতা করে।

থ্রি-ডি প্রযুক্তির এই মাউস গোটা মাউসের ইভোলিউশনে ভূমিকা রাখছে। অনেক আগে প্রচলিত ছিল ‘ডস সিস্টেম’। তারপর ‘অপটিক্যাল মাউস’, তারপর ‘ওয়্যারলেস মাউস’। এই তালিকার সর্বশেষ সংযোজন এই মাউস। আর ‘ওয়্যারলেস মাউস’ এর তুলনায় এর সুবিধা হল এটা ব্যবহার করার জন্য কোন ‘সারফেস’ লাগে না।

এটা বানাতে সুজনের খরচ পড়েছে ২৫০০ টাকার মত। তবে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করলে দাম কমানো যাবে।

শিক্ষাগতভাবে পুরকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী হলেও শখের বশে আর দশটা প্রোজেক্টের মতোই এই মাউস বানিয়েছেন সুজন। স্বপ্ন দেখেন আরও দারুণ দারুণ প্রযুক্তির মেলবন্ধন করে বাংলাদেশের পরিচয় বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে।


প্রতিবেদনটি তৈরী করেছেনঃ 
সাজেদুর রহমান সাজু, ৩য় বর্ষ, পুরকৌশল বিভাগ, বুয়েট।

যোগাযোগঃ ০১৬৭১-৯৯-৩৬-১৯ (শুভ)

Share Button

2 Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*