রোবোটাক্ষু-২

আমাদের পূর্বের রোবট ‘রোবোটাক্ষু’র পরিমার্জিত ও আধুনিক সংস্করণ হিসেবে এবার আমরা নিয়ে এসেছি স্পৃহা বা Speech Recognition Robot for In-house Assistance (SPRRIHA)।

গত বছর আই ইউটি তে অনুষ্ঠিত প্রোজেক্ট শোতে আমরা অংশ গ্রহণ করি। তাছাড়া আমাদের টিমের ৪ জন সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ইউরোপিয়ান রোভার চ্যালেঞ্জে অংশগ্রহণ করে। আমাদের দলের সদস্যরা হচ্ছে নওয়াব আমিনুল হক(ক্যাড ডিজাইন), মোহাম্মাদ মেহেদি হাসান (স্পিচ রিকগনিশন, রাস্পবেরি পাই), আশিক-ই-রাসুল (ইলেক্ট্রনিক্স), ইরফান মোহাম্মাদ আল হাসিব (অবজেক্ট ডিটেকশন, রাস্পবেরি পাই), আব্দুল মুহাইমিন রাহমান (ন্যাভিগেশন, পজিশনিং সিস্টেম, কন্ট্রোল ইঞ্জিনিয়ারিং)। আমাদের এই ৫ জনের টিমের নাম ‘উন্মাদ’।

রোবোটাক্ষু-২ এর বৈশিষ্ট্যসমূহ: আমরা রোবট যেন খুব দ্রুত কাজ করতে পারে সেধরণের এলগরিদম বের করার ব্যাপারে প্রচুর টিপস পেয়েছি। আগে যে রোবট বানিয়েছিলাম সেটার অন্যতম সমস্যা ছিল যে সেটাতে ইমেজ প্রসেসিং এর কাজ করতে অনেক সময় ব্যয় হত। ম্যাটল্যাবে কাজ করেছিলাম বলে।
এবার আমরা আগের রোবটের থেকেও উন্নত মানের কিছু বৈশিষ্ট্য যোগ করার চেষ্টা করেছি। প্রথমত আগের রোবট ছিল দূর নিয়ন্ত্রিত। এবার আমরা দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থা বাদ দিয়ে রোবটের ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করেছি। যেমন- এবার রোবটে স্পিচ রিকগনিশনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, আমরা ইংরেজিতে কিছু বললে, সেটা রোবট টেক্সটে কনভার্ট করে বোঝতে পারবে কি কি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আপাতত আমরা খুবই প্রাথমিক কিছু নির্দেশের ব্যবস্থা করেছি। জটিল সব বাক্য গঠনের জন্য ভবিষ্যতে আরও কাজ করা লাগবে।

আরেকটি ফিচার হচ্ছে ‘অবজেক্ট ডিটেকশন’। অর্থাৎ, রোবটটি কোন রুমে কোন বস্তুকে ডিটেক্ট করে , সেদিকে যেতে পারবে। আমরা এখন রোবটে রোবটিক আর্ম লাগানোর জন্য কাজ করছি, যাতে দূর থেকে দেখলে কোন বস্তুকে দেখলে ধরে নিয়ে আসতে পারে। এক্ষেত্রে স্পিচ রিকগনিশনের সাথে অবজেক্ট ডিটেকশন একই সাথে যুক্ত। কারণ রোবট কে নির্দেশ দিলে সে ওই নির্দেশ অনুযায়ী বস্তুকে খোজা শুরু করবে। এক্ষেত্রেও আমরা আমরা প্রাথমিক ধাপে রয়েছি, কারণ আমরা এই রোবটে ব্যবহার করছি রাস্পবেরি পাই। এটি একটি অন বোর্ড কম্পিউটার যার প্রসেসিং পাওয়ার খুব একটা বেশি না।

উপরের ফিচার সবগুলো নিয়ে আমরা অনেক কাজ করলেও পৃথিবীর অন্যান্য দেশে হয়তোবা আমাদের চেয়েও ভালো কাজ হচ্ছে। কিন্তু এই রোবটের যে বৈশিষ্ট্যটা খুবই কম কাজ হয়েছে , সেটা হচ্ছে রোবটের জন্য আলাদা ‘পজিশনিং সিস্টেম’! অর্থাৎ আমরা রোবটের জন্য আলাদা জিপিএস এর মত ব্যবস্থা করতে সক্ষম হয়েছি। একটা মাত্র ক্যামেরা এবং একটি জাইরোস্কোপের সাহায্যে আমরা রোবট একটা রুমের কোন অবস্থানে আছে সেটাও বের করতে পেরেছি, সে অন্য কোন অবস্থানে পাঠানোর কাজটাও করতে পেরেছি। এই পজিশনিং সিস্টেম নিয়েও বেশ কিছু কাজ হয়েছে। কিন্তু সেগুলোর সমস্যা রয়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে রোবটের হিসাব নিকাশে বিশাল সময় ব্যয় হয় সেগুলোতে। আমাদের পজিশনিং সিস্টেমে একটি সার্ভার কম্পিউটার রোবটের অবস্থান বের করেই তাকে তার স্থানাংক বলে দিচ্ছে। যার ফলে রোবটের কোন হিসাবনিকাশে সময় ই ব্যয় হচ্ছে না! বাকি-দুটো ফিচার প্রাথমিক ধাপে থাকলেও এই ফিচারের কাজ অনেক খানি এগিয়ে গিয়েছে। বাসায় পরীক্ষা নিরীক্ষা করার সময় ও দেখি এরর আসছে অনেক কম!

তবে যে বৈশিষ্ট্য তুলনামূলক ভাবে দুর্লভ , দেশে কম কাজ হয় , সেই নেভিগেশন সিস্টেম নিয়ে বেশ ভালোই কাজ এগিয়েছে । অর্থাৎ রোবটটিকে তার অবস্থান বাতলে দেওয়ার জন্য আলাদা একটি সিস্টেম তৈরি করা হয়েছে যা খুব ভালো কাজ করছে।

এই রোবটের আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে, আমরা পজিশনিং সিস্টেম নিয়ে কাজ করতে গিয়ে ‘ইমেজ প্রসেসিং’ এর এলগরিদম এবং স্ট্রাকচারে কিছু পরিবর্তন এনেছি। একই কাজ করতে ম্যাটল্যাবে অনেক সময় লাগত। আমরা ম্যাটল্যাবের সাথে ওপেনসিভি যোগ করে, ৬ গুণ দ্রুততার সাথে করতে সক্ষম হয়েছি!
একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের এই রোবট টা শুধু মাত্র একটি মডেল। এই কাজ গুলো ১০০% দক্ষতার সাথে করার জন্য আরও বড় সেটআপে হাই কনফিগারেশনের জিনিসপাতি লাগবে যেগুলো আমাদের পক্ষে যোগাড় করা সম্ভব ছিল না। তাই আমরা ছোট মডেলের ব্যবস্থা করি। ব্যবহারিক দিক বলতে অনেক কাজেই ব্যবহার করা সম্ভব। যেমন, শিল্প কারখানাগুলোতে একই রোবটের বিভিন্ন জায়গায় বস্তু স্থানান্তর করা লাগতে পারে। তখন আমাদের পজিশনিং সিস্টেম অনেক কাজে লাগতে পারে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: এই রোবটের কাজ এখনো শেষ হয় নি । খুব বড় কিছু ফিচার ডেভেলপ করেছি ঠিকই। কিন্তু আরও কিছু ফিচারের কাজ বাকি আছে । সেগুলো ও করতে থাকব ইনশাআল্লাহ। রোবটিক্স এ কাজ করে দেশের জন্য ভালো কিছু করার ইচ্ছা অনেক দিনের।

নেপথ্যে অবদান: এক্ষেত্রে Avtro HighTech এর দেওয়ান আরিফ ভাইয়ের কথা উল্লেখ করতে হয় । বুয়েটেকে গতবার ফিচার বের হওয়ার পর উনি আমাদের সাথে যোগাযোগ করে আমাদের প্রোজেক্টে আর্থিক ভাবে সহায়তা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন ।

সম্ভাবনা: এখন রোবটিক্স নিয়ে খুব ভালো মানের কাজ হচ্ছে দেশে। এখানে সেখানে বিভিন্ন প্রতিযোগিতাও হচ্ছে। কিন্তু কিছু সমস্যাও দেখা যায়। আমার কাছে মনে হয় ভালো মানের রোবটের জন্য খুব ভালো মানের আর্থিক সহযোগিতার প্রয়োজন। বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রোবটিক্স রিসার্চ ল্যাব হলে অথবা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রোবট গবেষণার জন্য ফান্ডিং দিলে দেশে রোবোটিক্সপনা আরও এগিয়ে যাবে ।

যেসকল জুনিয়রের রোবটিক্সে আগ্রহ আছে তাদের প্রতি পরামর্শ: যাদের রোবটিক্সে আগ্রহ আছে তাদের জন্য দুটো শব্দই বলব, “লেগে থাকো।” প্রথম প্রথম রোবট নিয়ে কাজ করার সময় অনেক কথা শুনতে হয়েছে। “এদেশে রোবটিক্স নিয়ে কাজ করে ভবিষ্যৎ নেই”, “চায়না জাপানে যেরকম সুবিধা পাওয়া যায় সেরকম সুবিধা এখানে পাওয়া যায় না” ইত্যাদি ইত্যাদি। ওইসব নেতিবাচক কথাবার্তা পাত্তা দিলে কিছুই হবে না। আমার কাছে চার্চিলের একটা কথা খুবই পছন্দের, “আপনি রাস্তা দিয়ে হাটার সময় ঘেউ ঘেউ করা প্রতিটা কুকুরকে তাড়াতে গেলে রাস্তা দিয়ে আর হাটা হবে না!”

সকল প্রতিবন্ধকতার মাঝেও তাই আমাদের নিজেদের উদ্দেশ্যের পিছনে লেগে থাকা উচিৎ, সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়াটাই হবে আমাদের প্রধান লক্ষ্য। এভাবে একদিন স্বপ্নগুলো সফল হবেই ইন শা আল্লাহ।

লিখেছেন-

আব্দুল মুহাইমিন রাহমান।
লেভেল-৪, টার্ম-২, যন্ত্রকৌশল বিভাগ, বুয়েট।

যোগাযোগঃ[email protected] (শুভ)

Share Button

2 Comments

  1. আমার খুবই প্রিয় সাবজেক্ট রোবটিক্স ৷ আমি আর আমার বন্ধু মিলে জেরী নামের একটা রোবোট তৈরীর কাজ করছিলাম যেটা দেখতে টম এণ্ড জেরীর জেরীর মতো ৷ কিন্তু পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাবে আমরা এক পর্যায়ে উৎসাহ হারিয়ে ফেলি ৷

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*