স্বল্প খরচে মোটরাইজড হুইলচেয়ার

কিন্তু কিছু মানুষের স্বপ্ন আর উদ্যম আছে বলেই হয়ত পৃথিবীটা এখনও অনুপ্রেরণার। এমনই এক অসাধারণ পদক্ষেপ নিয়েছেন বুয়েটের একদল ইঞ্জিনিয়ার। পঙ্গু, প্রতিবন্ধী কিংবা বৃদ্ধ, যাদের করুণ নিশ্চলতা আর অসহায়ত্ব জড় বস্তুর মত আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়, তাদের জন্য তৈরী করেছেন মোটরাইজড হুইল চেয়ার( Motorized Wheel Chair)।

এ ব্যাপারে প্রজেক্টের উদ্যোক্তাদের সাথে কথা বললে তাঁরা জানান, এই কাজের মূল চালিকাশক্তি বিবেকের তাড়না। রাস্তায় চলতে গিয়ে কিংবা তাঁদের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা থেকে তাঁরা দেখেছেন, যারা চলাফেরায় অক্ষম, তারাই সবচাইতে উপেক্ষিত আর অবহেলিত। রাস্তার পঙ্গু ভিখারী যদি কারো সাহায্য ছাড়াই চলতে পারত তবে সে হয়তো কিছু একটা বিক্রয় করে সংসার চালানোর চেষ্টা করতো, বৃদ্ধ বাবাকে হয়তো চলাফেরার জন্য ছেলের কর্মব্যস্ত সময়ের অপচয়ের কৈফিয়ত দিতে হত না। এমন অনেকে আছেন যারা হয়তো কোনো বিশেষ অসুস্থতার কারণে শুধুই একটি আঙ্গুল নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। এই মোটরাইজড হুইল চেয়ার সেই সব মানুষের জন্যই তৈরী করা, যেন শুধু একটি আঙ্গুল, বা শুধুই এক হাত দিয়েই তা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

উদ্যোক্তারা আরও জানান, এ ব্যাপারে CRP(The Centre for the Rehabilitation of the Paralyzed) থেকে যোগাযোগ করেন সেখানকার একজন স্বেচ্ছাসেবক আরহাম চৌধুরী। আরহাম চৌধুরী CRP এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সক্রিয় এবং আন্তরিক একজন কর্মী। তার উৎসাহ আর অনুপ্রেরণায় এ প্রজেক্টের কাজ বেগবান হয়। এ ধরণের মোটরাইজড হুইল চেয়ারের দাম সাধারণত দেড় থেকে দুই লাখ পর্যন্ত হয়ে থাকে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। এই খরচ কমিয়ে আনা ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য।

এই প্রজেক্টের সকল টেকনিকাল সহায়তা দেয় Surge Engineering নামক একটি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত আছেন বুয়েটের নিলয় দাশ(EEE ’02), মাজেদুর রহমান মাসুম(ME ’09), আপন দস্তিদার(EEE ’11) এবং সুজয় তালুকদার(ME ’09). এই প্রজেক্টের সকল কাজে তাদের সাহায্য ছিল উল্লেখ করার মত।

এই হুইলচেয়ার সাধারণত দুই ধরনের হতে পারে। ফোল্ডিং এবং ফিক্সড- এই দুইয়ের মধ্যে তারা বেছে নিয়েছেন ফোল্ডিং, যা ভাঁজ করে রাখা যায়। এক আঙ্গুলে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করার জন্য তারা বেছে নেন জয়স্টিক কন্ট্রোলার সিস্টেম। তারপর এলো আসল চ্যালেঞ্জ, আর তা হলো যথোপযুক্ত মোটর কন্ট্রোলার এবং মোটর সিলেক্ট করা এবং সেগুলো যোগাড় করা। কিন্তু কোনভাবেই তাদের মোটরের উপযুক্ত কন্ট্রোলার পাওয়া যাচ্ছিলোনা, কাজ করার সময় দেখা যেত সেটা পুড়ে যাচ্ছে। এই মোটর কন্ট্রোলারগুলো এত বেশি বিদ্যুৎ পরিবহনের জন্য উপযুক্ত ছিলো না। দীর্ঘ এক মাস ধরে তারা বিভিন্ন জায়াগায় উপযুক্ত মোটর কন্ট্রোলারের জন্য খোঁজ চালিয়ে গেছেন, কিন্তু তবুও তা পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত USA থেকে মোটর কন্ট্রোলার আনার ব্যবস্থা করা হয়।

অবশেষে এই মোটর কন্ট্রোলার ঠিকঠাক কাজ করলো। আগের মত পুড়ে যাওয়ার সমস্যা আর থাকলো না। আর এই মানুষগুলোও আরেক ধাপ এগিয়ে গেলেন তাদের স্বপ্নের পথে।

CRP থেকে যখন তাদের কাছে এই প্রজেক্টের ব্যাপারে বলা হয় তখন একটা ব্যাপারে ছিলো বিশেষ নজর, আর তা হলো যন্ত্রের ক্রয়মূল্য। এই ধরনের মোটরাইজড হুইল চেয়ার বিদেশ থেকে হয়তো ক্রয় করা সম্ভব, কিন্তু বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জন্য তা হয়ত অনেক ক্ষেত্রেই অসম্ভব। তাই প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ারদের প্রধান লক্ষ্য ছিলো এই খরচ কমিয়ে আনা আর তারা এই ক্ষেত্রে সফলও। এই ব্যাপারে মাজেদুর রহমান মাসুম(ME ’09 BUET)এর সাথে কথা বলে জানা যায়, এই হুইলচেয়ারে যে যান্ত্রিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন তার মোট খরচ পড়বে আনুমানিক ৩৫-৪৫ হাজার টাকা মাত্র।

এই প্রজেক্টের আরেকজন ইঞ্জিনিয়ার আপন দস্তিদার(EEE ’11 BUET) এর সাথে কথা বলে জানা যায় এই প্রজেক্টের বিশেষ কিছু দিক। এই সব দিকের মধ্যে একটি হলো, রিজেনারেটিভ ব্রেক। এটা এমন একধরনের ব্রেক, যা যন্ত্রের গতি কমিয়ে এর গতিশক্তিকে রুপান্তর করে রাখে যা তাৎক্ষনিক ব্যবহার করা যায় বা জমা করে রাখা যায়। এটি অনেক ক্ষেত্রেই দুর্ঘটনার হার কমিয়ে আনে এবং যন্ত্রকে দীর্ঘস্থায়ী করে। এ ধরনের ব্রেকের ব্যাপারে আরও জানতে ক্লিক করতে পারেন (https://en.wikipedia.org/wiki/Regenerative_brake)।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো এই যন্ত্রের প্রোগ্রামিং এমনভাবে করা হয়েছে যাতে এর গতি ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব প্রোগ্রামিং এর মাধ্যমে। অর্থাৎ ব্যবহারকারীর সুবিধা অনুযায়ী এর গতি কমানো বা বাড়ানী সম্ভব। এর ফলে শারীরিক অবস্থা বা বয়স বিবেচনার মাধ্যমে কিংবা কাজের পার্থক্য অনুযায়ী গতি পরিবর্তন করে এই হুইলচেয়ারকে আরও বেশি সময়োপযোগী করা সম্ভব।

অবশেষে সেই দিন এলো। জানুয়ারীর ২১ তারিখ, ২০১৬। হুইলচেয়ারের কাজ শেষ হওয়ার পর তারা এর কার্যকারীতা পরীক্ষা করতে নিয়া যান CRP তে। সেখানে প্রতিবন্ধীদের এই হুইলচেয়ার ব্যবহার করতে দেওয়া হয়। CRP এর প্রতিষ্ঠাতা ভ্যালেরি অ্যান টেইলর, যাকে বলা হয় বাংলাদেশের মাদার তেরেসা, (https://en.wikipedia.org/wiki/Valerie_Ann_Taylor) এই কাজ দেখে খুবই খুশি এবং মুগ্ধ হন। তারা জানান, এই ধরনের কাজ আরও বেশি করা হলে প্রতিবন্ধীদের জীবন অনেকটাই সহজ হয়ে উঠবে।

এই প্রজেক্টের সফলতার জন্য পুরো গ্রুপের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা এবং বিভিন্নজনের কাছ থেকে পাওয়া সাহায্যের কথা বারবার মনে করিয়ে দেন মাজেদুর রহমান মাসুম। বুয়েটের হলে থাকা ১৩ ও ১৪ ব্যাচের ছোট ভাইদের কাছে বিভিন্ন কারণে তিনি সাহায্য পেয়েছেন বলে জানান। তার ভাষায়, “জুনিয়রদের সাহায্য ছাড়া এই প্রজেক্ট আরও অনেক বেশি কষ্টকর হতে পারতো। ছোটোখাটো ব্যাপারে তাদের উপস্থিতি এই প্রজেক্টের কাজকে গতি দিয়েছে।”

এই প্রজেক্টে সফলতার পর তারা এই কাজকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন। আগের প্রজেক্টের ভুলগুলো শুধরে নিয়ে আর নতুন কিছু বৈশিষ্ট্য যোগ করার কাজ শুরু করেছেন তারা। এবারের প্রজেক্টে তারা যোগ করছেন রিভার্স করার সুবিধা, যা আগেরটিতে সময়ের স্বল্পতার কারণে করা হয়নি। এছাড়া যারা শুধু মাথা নাড়াতে পারেন কিংবা কথা বলতে পারেন, তাদের ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার জন্য কাজ করা হচ্ছে বলে জানান এই কর্মকান্ডের সাথে সংশ্লিষ্টরা।

উদ্যোক্তারা স্বপ্ন দেখছেন একদিন বাংলাদেশের শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষেরা এই সাশ্রয়ী হুইলচেয়ার ব্যবহার করে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারবে। সেদিনই তাঁদের সকল শ্রম সার্থক হবে।

যোগাযোগ

মাজেদুর রহমান মাসুম, [email protected]

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

Share Button

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*