মন্তরযন্তর- ইশারায় চলে রোবট!

ধরুন আপনি হাত দিয়ে ইশারা করলেন আর একটা রোবট আপনার ইশারায় সাড়া দিয়ে সামনে এগিয়ে গেল।কিংবা কখনো ডানে-বায়ে,যখন যেমন খুশি। প্রয়োজন শুধু আপনার একটি ইশারা। সেই সাথে রোবটটির আবার রয়েছে বেশ কাজের একটা হাতও।যা দিয়ে আপনি সহজেই তুলে আনতে পারবেন প্রয়োজনীয় কিছু। এই চিন্তাটাকেই বাস্তবে রূপ দিয়েছে যন্ত্রকৌশল বিভাগের চার শিক্ষার্থী।

মোফাসসির উদ দৌলা নিশান, সাদমান তাহমীদ সুহৃদ, সৌরভ দাশ ও মির্জা মোঃ তানজীম শরীফ মুগ্ধ। সবাই বুয়েটের মেকানিক্যাল’১২ ব্যাচের। লেভেল-৩,টার্ম-১ এ টার্ম প্রজেক্ট হিসেবে তাঁরা তৈরী করে, “Wireless Controlling and Monitoring of Gesture Controlled UGV (Unmanned Ground Vehicle) । বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রজেক্ট শোতে অংশ নিয়ে চ্যাম্পিয়নও হয়েছে তারা।ওয়ারলেস নেটওয়ার্কের মাধ্যমে হাতের ইশারায় রোবটকে যে কেউ চালাতে পারবে। সাথে আবার আছে পাঁচ ডিগ্রি অফ ফ্রিডমের একটা রোবোটিক আর্ম। “ইচ্ছা ছিল এমন কিছু করার যা সরাসরি ভাবে আমাদের কাজে লাগবে” বললেন নিশানরা।

ইচ্ছা থেকেই আইডিয়ার জন্ম আর তা থেকে বাস্তবায়ন। যার জন্য কখনো বা নবাবপুর,পাটুয়াটুলি বা টিপু সুলতান রোড ঘুরে বেড়িয়েছে তারা। “প্রজেক্টটা করে আমরা শিখেছি কি করে সবকিছু ম্যানেজ করতে হয়”।  সলিডওয়ার্ক্স ডিজাইন দিয়ে শুরু, তারপর সেই অনুযায়ী বডি স্ট্রাকচার তৈরী করা,রোবোটিক আর্ম,গিয়ার কাটানো সবকিছু ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়ে গেছে তারা।তারপর এল কন্ট্রোল এর ব্যাপার। TCP Protocol  এর মাধ্যমে Wi-Fi module এর কোডিং করা, সার্ভো মোটর কন্ট্রোল করা এভাবেই ধীরে ধীরে তৈরী হল তাদের ‘মন্তরযন্তর’। হাতের ইশারায় অনেকটা মন্তরের বলে কাজ করে বলে মজা করে এই নাম দেওয়া ওদের।

এই রোবট ব্যবহার করা যেতে পারে কোন বিধ্বস্ত কোনো দালানে ভিডিও সার্ভেইলেন্সের কাজে। যেহেতু রোবটে লাগানো আছে একটি অ্যান্ড্রয়েড ক্যামেরা, আর সেটি wi-fi দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, ফলে বাইরে থেকে ধ্বংসস্তুপের ভেতরের অবস্থা জানা যাবে।

পুর্নাংগ রোবটিক্স বলতে মেকানিক্যাল আর ইলেকট্রিক্যাল এর সমন্বয়কেই বুঝায়। ওদেরও চেষ্টা ছিল শুধু মাইক্রোইলেকট্রনিক্স বেইজড কিছু না করার। তাই রোবটের মেকানিক্যাল দিকটা নিয়েও বেশ কাজ ছিল ওদের। CAD ডিজাইন করে তাই বাস্তবায়ন করেছে মেকানিক্যাল আর্ম যাতে ছিল ৪ খানা সার্ভো মোটর ও ১ টা DC মোটর। ৫ টা মোটর এর সাহায্যে নিয়ন্ত্রণ করা যায় 5-Joint Mechanical Arm কে।

রোবটের ওপর রাখা অন-বোর্ড ক্যামেরা দিয়ে সার্ভেইল্যান্সের কাজও করা যাবে। যার ফলে যেকোন উদ্ধার কাজেও চমৎকার সহায়তা করতে পারবে এই যন্ত্র। দুই হাতে পরা দুখানা গ্লাভসেই আছে এর Control Unit। যার মধ্যে থাকা  Flex Sensor আর Accelerometer  এর সাহায্যে গাড়ির চলাফেরা ও পাঁচ ভাবে ঘুরতে পারে এমন একটা রোবটিক আর্ম নিয়ন্ত্রণ করা যায়,দূর থেকেই। সেন্সর গুলো থেকে নেয়া ডাটা ফিডব্যাক নিয়ে তা ওয়াইফাই মডিউলের সাহায্যে পাঠিয়ে দেয়া হয় রোবটে থাকা রিসিভার মডিউলে,যেখান থেকে সিগন্যাল ডিকোড করে চলে রোবট, নড়ে তার হাত।

সাদমান তাহমীদ সুহৃদ জানান, এই প্রজেক্ট করতে গিয়ে সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ ছিলো যথেষ্ট পরিমাণ ভার বহনের উপযোগী করা এবং একে অসমান রাস্তায় চলার উপযোগী করে তোলা। এই সমস্যা মোকাবেলায় তারা যন্ত্রের কাঠামো আরও শক্তিশালী করেন অ্যাক্রিলিক ৫ মিমি শিট ব্যবহার করে, আরও ব্যবহার করেন হাই টর্ক সার্ভো মোটর আর গিয়ার শেপড হুইলস।

সম্পূর্ণ নিজেদের খরচে এই রোবট বানানোর পেছনে পরিবারের সদস্যদের অনুপ্রেরণার কথা বলেন তারা।সেই সাথে সজল ভাইএর কথাও, নতুন একটা উদ্যোগ নেবার ব্যাপারে যিনি সবসময় সাহস যুগিয়েছেন, সাহায্যও।
ভবিষ্যতে এই প্রজেক্ট নিয়ে গবেষণা পত্র লেখার ইচ্ছাও আছে ওদের।ইচ্ছা আছে আরো নতুন নতুন ফিচার যোগ করার। অবশ্যই নতুন এবং প্রয়োজনীয়। এর মধ্যে আছে প্রথমেই আছে রোবট নিয়ন্ত্রণের কাজে  RF Module  ব্যবহার করা। যাতে করে রোবট হবে আরো Responsive, বাড়বে একটি কন্ট্রোল অপশনও। Gesture Control ফিচার ব্যবহার করে শারীরিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষদের জন্য ও কিছু করা সম্ভব বলে মনে করে তারা।

Share Button

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*