বাংলাদেশের আন্ডারগ্রাড থিসিসের কাজ যখন নেচারের সাময়িকীতে

“নেচার বা সায়েন্স সাময়িকী”-র নাম আমরা পত্র পত্রিকায় প্রায়ই দেখে থাকি। কারণ, এসব সাময়িকীতে সাধারণত যুগান্তকারী এবং সমসাময়িক গবেষণার কাজ থেকে প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশ থেকে সাধারণত খুব কম সংখ্যক আর্টিকেলই এরকম সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষ করে পদার্থবিজ্ঞান, ন্যানোটেকনোলজি এবং বর্তমান যুগের বহুল আলোচিত আবিষ্কার গ্রাফিন বিষয়ে আমাদের দেশ থেকে এরকম কোন সাময়িকীতে কোন আর্টিকেল নেই বললেই চলে। এর কারণও খুব সহজেই অনুধাবনযোগ্য।আমাদের দেশে এরকম গবেষণা করার মত পরীক্ষাগার এবং ফান্ডিং কোনটিই নেই। কিন্তু এত কিছুর পরও বুয়েট-এর তড়িৎ ও ইলেক্ট্রনিককৌশল বিভাগের ০৯ ব্যাচ এর আয়েদ আল সায়েম-এর একটি গবেষণা প্রবন্ধ নেচার পাবলিশিং গ্রুপ-এর সাময়িকী “সায়েন্টিফিক রিপোর্টস” এ প্রকাশিত হয়েছে। এই কাজটি তড়িৎ ও ইলেক্ট্রনিককৌশল বিভাগের প্রফেসর ডঃ মোঃ সাইফুর রহমান-এর তত্ত্বাবধানে আন্ডারগ্রাজুয়েট থিসিসে করা হয়েছে। কাজটির সাথে আরও ছিলেন মোহাম্মদ মাসদুর রাহমান (বুয়েট ০৮), মাহদী রাহমান চৌধুরী (বুয়েট ০৫, বর্তমানে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ সিঙ্গাপুর এ পি. এইচ. ডি প্রার্থী) এবং ইফাত জাহাঙ্গীর (বুয়েট ০৫, বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অফ সাউথ ক্যারোলিনা এ পি. এইচ. ডিপ্রার্থী) যারা বিভিন্নভাবে কাজটিতে সহায়তা করেছেন।

নেচার সায়েন্টিফিক রিপোর্টস-এর ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর ৫.৫৮। ইম্প্যাক্ট ফ্যাক্টর একটি বিজ্ঞান সাময়িকী’র জনপ্রিয়তা এবং গুরুত্ব নির্দেশ করে থাকে। আমাদের বাংলাদেশ থেকে এবং বিশেষ করে আন্ডারগ্রাজুয়েট থিসিসের কাজ থেকে এরকম সাময়িকীতে কোন প্রবন্ধ প্রকাশিত হওয়া সত্যিকার অর্থেই একটি ব্যাতিক্রম এবং অনুপ্রেরণাদায়ক ঘটনা। এ ব্যাপারে ডঃ মোঃ সাইফুর রহমান (অধ্যাপক, তড়িৎ ও ইলেক্ট্রনিক কৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়) বলেন,

“২০১১ সালে বুয়েট-এ অধ্যাপক ডঃ মোঃ আব্দুল মতিন স্যারের থিসিসের ছাত্র মাহদী, যুবরাজ এবং নোমান এন্টেনায় মেটাম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করে সাফল্য লাভ করে। সে সময় মাহদী “BUET Electromagnetics and Meta-material research group” প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করে। প্রাথমিকভাবে এ গবেষক দলে শিক্ষক হিসাবে অধ্যাপক মতিন স্যার এবং আমি অন্তর্ভূক্ত হই। উল্লেখ্য যে, ইলেক্ট্রম্যাগনেটিকস ওপর করা গবেষণা কাজের ফলাফল থেকে পরবর্তীতে এ দলের সদস্যদের বেশ কিছু গবেষণা প্রবন্ধ আন্তর্জাতিক জার্ণালে প্রকাশিত হয়েছে, যার মধ্যে গত বছর একটি প্রবন্ধ “Annalen Der Physik” সাময়িকীর প্রচ্ছদ হবার যোগ্যতাও অর্জন করেছে। কনিষ্ঠতম সদস্য হয়েও আয়েদ আল সায়েমের নাম এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যে উক্ত গবেষণা প্রবন্ধটিতেও দ্বিতীয় লেখক ছিল। গবেষণাক্ষেত্রে আয়েদ আল সায়েম তার পারদর্শীতাকে কাজে লাগিয়ে একের পর এক নব উদ্ভাবনের স্বাক্ষর রেখে চলেছে- যা বাংলাদেশের জন্য অসামান্য গৌরব বয়ে এনেছে- যার সর্বশেষ সংযোজন হল নেচার পাবলিশিং গ্রুপে প্রকাশিত আলোচিত এই প্রবন্ধটি। এসব গবেষকদের মাঝে মাহদী সহ বেশ কয়েকজন গবেষক বর্তমানে বিদেশে পি. এইচ. ডি. প্রোগ্রামে গবেষণারত আছে এবং অনেক ব্যস্ততার মাঝেও সে নিয়মিত দেশের গবেষকদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে এবং নানাভাবে উপদেশ ও পরামর্শ দিয়ে চলেছে।”

ইউরোপ আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে এ ধরণের উচ্চ ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর-এর সাময়িকীতে প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়, যার পেছনে রয়েছে উন্নতমানের পরীক্ষাগার এবং ইন্ডাস্ট্রিগুলো থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ ফান্ডিং; এবং এই কাজগুলো সম্পন্ন হয় পি. এইচ. ডি এবং পোস্টডক্টরেটদের দ্বারা। সেখানে সম্পূর্ণ থিওরেটিকাল এবং বিশেষ করে আন্ডারগ্রাজুয়েট থিসিসের কাজ থেকে কোনরকম এক্সপেরিমেন্ট ছাড়াই এরকম সাময়িকীতে কোন প্রবন্ধ প্রকাশিত হওয়ার মাধ্যমে এটাই প্রমাণিত হয় যে, আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে আমাদের শিক্ষার্থীরাও উন্নত বিশ্বের সাথে তাল রেখে সমসাময়িক গবেষণাকাজ করতে সক্ষম। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, গবেষণার ঠিক এই বিষয়েই আমেরিকার এম. আই. টি., ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া সান ডিয়েগো, ইয়েল ইউনিভার্সিটি, স্পেনের আইসিফও সহ বিশ্ববিখ্যাত বেশ কিছু ইউনিভার্সিটি এবং রিসার্চ ইন্সটিটিউট-এর বেশ কিছু রিসার্চ গ্রুপ কাজ করে।

এই কাজে গ্রাফিন এবং হেক্সাগনাল বোরন নাইট্রাইড-এর সমন্নয়ে একটি নতুন অপ্টইলেক্ট্রনিক ডিভাইস প্রস্তাব করা হয়েছে। হেক্সাগনাল বোরন নাইট্রাইড গ্রাফিনের মত একটি 2D (দ্বিমাত্রিক) ম্যাটেরিয়াল। সম্প্রীতি হেক্সাগনাল বোরন নাইট্রাইড-এর আলোক ধর্ম নিয়ে ব্যাপক গবেষণা হয়েছে। কারণ, এটি প্রাকৃতিক হাইপারবোলিক ম্যাটেরিয়াল হিসেবে কাজ করে। এর আগে হাইপারবোলিক ধর্ম কেবলমাত্র কৃত্রিমভাবে প্রস্তুত ম্যাটেরিয়ালই দেখাতে পারত, যা মেটাম্যাটেরিয়াল নামে পরিচিত। হাইপারবোলিক ম্যাটেরিয়াল-এর একটি বিশেষ ধর্ম হছে এটি ঋণাত্তক প্রতিসরণাংক প্রদর্শন করতে সক্ষম, যা প্রাকৃতিক পদার্থের ক্ষেত্রে বিরল। হেক্সাগনাল বোরন নাইট্রাইড প্রাকৃতিক হাইপারবোলিক ম্যাটেরিয়াল হওয়ায় এটি ঋণাত্তক প্রতিসরণ প্রদর্শন করতে সক্ষম হলেও এর উচ্চ প্রতিফলনের কারণে খুব কম পরিমাণ আলো ট্রান্সমিট হতে পারে। এই কাজটিতে গ্রাফিন এবং হেক্সাগনাল বোরন নাইট্রাইড- একীভূত করার মাধ্যমে এই সমস্যা দূর করার একটি পথ দেখানো হয়েছে। গ্রাফিন-এর 2D অপ্টইলেক্ট্রনিক এবং হেক্সাগনাল বোরন নাইট্রাইড-এর হাইপারবোলিক ধর্ম কাজে লাগিয়ে এমন একটি নতুন ডিভাইস তৈরি করা সম্ভব, যা একইসাথে ঋণাত্তক প্রতিসরণাংক এবং সর্বোচ্চ পরিমাণ আলো প্রতিসরণ করতে সক্ষম।
এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেক্ট্রনিক কৌশল বিভাগের সাবেক শিক্ষক এবং বর্তমানে কানাডার ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াটারলুতে কোয়ান্টাম ইনফরমেশনে পিএইচডি’রত মিঃ শিহান সাজিদ আরো যোগ করেন,

“দেশে বেসিক পড়াশোনা শেষ করার পর, একজন ছাত্র দেশ ত্যাগ করে বিদেশে গিয়ে, ওদের পয়সায় রিসার্চ করে যখন একটা ভালো গবেষণা করে, সেই আউটপুটে আমাদের দেশের ক্রেডিট বা অর্জন খুবই সামান্য। বরং এই ধরনের আন্ডারগ্র্যাড প্রোজেক্ট, যেগুলা নেচার সায়েন্টিফিক রিপোর্টস এঁর মত জার্নাল পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছে, সেগুলা নিয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় গুলো কৃতিত্বের দাবি করতে পারে। এই ধরনের অর্জনের গুলাকে যদি একটু ভালো করে মূল্যায়ন করা হতো, সেটা আর্থিকভাবে পুরস্কৃত করে বা অন্য যেকোনো ভাবেই হোক, তাহলে হয়তো এই ধরনের ঘটনা আরও বাড়ানো যেত।”

পরিশেষে বলতে হয় – গবেষণা করে শুধু গবেষণা প্রবন্ধ ছাপলেই চলবে না, আমাদেরকে এর প্রয়োগের দিকটিও বিবেচনায় নিতে হবে; নাহলে আমাদের দেশের মানুষ এর সুফল লাভ করতে পারবেনা।এর জন্য আমাদের ল্যাবরেটরীর সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে এবং সরকারকে উচ্চ-শিক্ষা ও গবেষণা খাতে বিশেষ বাজেট বরাদ্দ রাখতে হবে। যেমন, বুয়েটে এ সংক্রান্ত হার্ডওয়্যার বিষয়ে গবেষণা কাজের জন্য ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ও মেটা-মেটিরিয়েল রিসার্চ ল্যাবরেটরী নেই। বিশেষ করে, বাংলাদেশে কাজ করেই যে গবেষক দলগুলো উচ্চ ইমপ্যাক্ট-সম্পন্ন আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করছে, তাদের পুরস্কৃত করার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করা গেলেই হয়ত তাদের থেকে একদিন সত্যেন বোস, জামাল নজরুল ইসলাম কিংবা আব্দুল্লাহ আল মামুন এর মত বড় মাপের বিজ্ঞানীরা আবার ও বের হয়ে আসবেন, যারা শুধু মাত্র থিওরেটিকাল কাজ করেই বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন।

Share Button

1 Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*