১ হাজার টাকায় ভূমিকম্প পূর্বাভাস যন্ত্র বানিয়েছেন ৪ বুয়েট শিক্ষার্থী!

“ভূমিকম্প হচ্ছে? আসলেই?? নাকি মাথা ঘুরছে আমার?? ফেসবুকে যেয়ে স্ট্যাটাস চেক করে শিওর হই আগে!”

বাংলাদেশী হয়ে থাকলে উপরের অবস্থার শিকার হয়ে থাকাটা যথেষ্ট স্বাভাবিক বলেই ধরে নেয়া যায়। ভূমিকম্প মাপন যন্ত্র আবিষ্কৃত হলেও ভূমিকম্প আসছে এমন ভবিষ্যদ্বাণী করা যন্ত্র এখনও সেভাবে প্রচলিত হয়নি। যে উপায়গুলো প্রচলিত সেগুলোও যথেষ্ট ব্যয়বহুল। স্বল্পমূল্যে এমন একটি যন্ত্র বানিয়েছেন বুয়েটের ৪ শিক্ষার্থী। প্রজেক্ট মেম্বাররা হলেন- বুয়েটে যন্ত্রকৌশল বিভাগের তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত রিফাত ইবনে আজাদ তানিম, আলম মুহাম্মদ রিজভী, রিয়াল আল ফারাবী এবং গৌরব মুস্তাফা।

তাদের উদ্ভাবিত যন্ত্র সম্পর্কে জানতে ভূমিকম্পের আচার ও প্রকৃতি সম্পর্কে প্রাথমিক কিছু বিষয় জানা প্রয়োজন।

ভূমিকম্পে দুই ধরনের তরঙ্গ তৈরি হয়। প্রাইমারী ওয়েভ বা অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গ এবং সেকেন্ডারি ওয়েভ অনুপ্রস্থ তরঙ্গ। এই যন্ত্রের মাধ্যমে যেটা পাওয়া যায় সেটা হল সেকেন্ডারি ওয়েভ। প্রাইমারী ওয়েভ সেকেন্ডারি ওয়েভের চেয়ে দ্রুত পরিভ্রমণ করে। নিচের গ্রাফের সাহায্যে ব্যাপারটা হয়ত আরেকটু ভালো বোঝা যাবে।

গ্রাফে P দিয়ে প্রাইমারী ওয়েভ আর S দিয়ে সেকেন্ডারী ওয়েভকে বোঝানো হয়েছে। এখানে  সেকেন্ডারী ওয়েভ আর প্রাইমারী ওয়েভের বেগ মাটির নিচে কোথায় কত দেখা যাচ্ছে। উপরের গ্রাফ লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে প্রাইমারি ওয়েভ এর গতিবেগ ভূপৃষ্ঠে ৮ কিমি/সেকেন্ড যেখানে সেকেন্ডারি ওয়েভ এর গতিবেগ ৫কিমি/সেকেন্ড। কিন্তু ভূমির গভীরতা যত বাড়ে প্রাইমারী ওয়েভ এবং সেকেন্ডারীর মধ্যে বেগের পার্থক্য ততই বাড়তে থাকে।

২০১১ সালে টোকিওতে প্রাইমারী ওয়েভ ডিটেক্ট করে ৮০ সেকেন্ড আগে ওয়ার্নিং দেওয়া সম্ভবপর হয়েছিল। ভূমিকম্পের এপিসেন্টার কত দূরে এর উপর নির্ভর করে সেকেন্ডারি ওয়েভ থেকে প্রাইমারী ওয়েভ কতক্ষণ আগে এসে আঘাত করবে। ঠিক একারণে যদি প্রাইমারী ওয়েভ ডিটেক্ট করা সম্ভব হয় তবে আপনি সেকেন্ড ওয়েভ আসার কিছু সময় আগেই ভূমিকম্পের আগাম সংকেত জেনে যাবেন।

আর এসব থেকেই শিক্ষার্থীদের মাথায় চিন্তা এসেছিল Earthquake Primary Wave Detector বানানোর। মেকানিকাল ৩-১ এর টার্ম প্রজেক্ট হলেও ইচ্ছা ছিল এমন কিছু বানানোর যা মানুষের ভালো কাজে আসে। দলের সদস্যরা বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষক মঞ্জুর মোর্শেদ এবং পার্থ কুমার দাসের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এই প্রজেক্টের বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষকদ্বয়ের প্রেরণা ও মূল্যবান উপদেশের জন্য। এই দলের ৪ সদস্য মনে করেন তাদের উদ্ভাবিত যন্ত্রের মাধ্যমে কোনদিন যদি একজন মানুষের জীবন ও রক্ষা পায় তবেই তাদের কাজ সার্থক হবে।

শুরু থেকে দলের সদস্যদের লক্ষ্য ছিল প্রাইমারি ওয়েভ সনাক্তকরণের জন্য তারা যন্ত্র বানাবেন। যন্ত্রটি প্রাইমারী ওয়েভ সনাক্ত করে এলার্ম দিবে। বর্তমানি যন্ত্রটি সূক্ষাতিসুক্ষ কম্পন অনুভব করলে আলো জ্বালিয়ে এবং এলার্ম দিয়ে ব্যবহারকারীকে সতর্ক করে। বাসা বাড়ীতে ব্যবহারের মত উপযোগী করে তৈরি করা হলেও বাসা বাড়ীতে ব্যবহার করার প্রধান অসুবিধা যন্ত্রটি কম্পনের ব্যাপারে যথেষ্ট স্পর্শকাতর হওয়ায় ফলস এলার্ম দিয়ে ব্যবহারকারীদের আতঙ্কে ফেলে দিতে পারে। একারণেই তারা পদ্ধতির বাস্তবায়নেও বেশ কিছু পরিবর্তন আনেন।

দলের সদস্যরা এবার যন্ত্রটিকে নিয়ে WSP (Wide scale plan) এর দিকে এগুতে থাকেন। বাংলাদেশের সব আবহাওয়া অফিসে ভূপৃষ্ঠের নিচে সুবিধাজনক গভীরতায় তারা ১০ টা করে সনাক্তকারী ডিভাইসগুলো বসানো তাদের পরিকল্পনার অংশ। ধরা যাক, মায়ানমারের কোন ফল্ট থেকে প্রাইমারী ওয়েভ প্রোপাগেট শুরু করল। তাহলে খুব স্বাভাবিক ভাবেই চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, বান্দরবনের ডিটেক্টরগুলো সব একসাথে একটিভেট হয়ে যাবে। তিন রিজিওনেই যেহেতু একটিভেট হচ্ছে তাহলে ফলস এলার্ম আসার সুযোগ নাই একদমই। আমাদের পরিকল্পনা যন্ত্রগুলো এলার্ম দেওয়ার সাথে সাথে তড়িৎচৌম্বকীয় সংকেতের সাহায্যে নিমিষেই সকল আবহাওয়া অফিসগুলোতে জানিয়ে দিবে। শিক্ষার্থীরা একটি মোবাইল এপ্লিকেশন তাদের প্রজেক্টের অংশ হিসেবে রেখেছেন যেটা আবহাওয়া অফিস কোন সতর্কবার্তা পেলেই সাথে সাথে এপ্লিকেশন ব্যবহারকারীদের সংকেত দিয়ে জানিয়ে দিবে। এভাবে ভূমিকম্প আসার ন্যুনতম ১৫-২০ সেকেন্ড আগে মানুষ নিজেদেরকে প্রস্তুত করার সময় পাবে। এরকম বিপদজনক সময়ে ১৫-২০ সেকেন্ডের সময় বাঁচিয়ে দিতে পারে হাজারো প্রাণ।

Primary wave detector

যন্ত্রটি বানানোর জন্য নেওয়া হয়েছে IMU sensor এর সাহায্য। ত্রিমাত্রিক ব্যবস্থায় বস্তুর ঘূর্ণন শনাক্তকরণ জন্য এই সেন্সর কাজে লাগে। প্রাথমিক ভাবে যন্ত্রটির উদ্দেশ্য ছিল x,y,z অক্ষের সাপেক্ষে ঘূর্ণন পরিমাপ করা। কিন্তু সূক্ষ্ম ও নির্ভুল পরিমাপের জন্য এই ব্যবস্থার চেয়ে কোয়াটারনিয়ন ডিটেকশন অনেক বেশী সুবিধাজনক বলে কোয়াটারনিয়ন ডিটেকশনের সাহায্য নেন দলের সদস্যরা। ফলে খুব সামান্য ভাইব্রেশন হলেও তা সনাক্ত করতে সক্ষম এখন যন্ত্রটি।

সেন্সর টি ৬ ধরণের ফলাফল দিতে পারে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুটি-

1.Yaw, Pitch, Roll

2.Quaternion

প্রথম অপশনকে ভিত্তি ধরে দলের সদস্যরা শুরুর কয়েকমাস নিরীক্ষণ চালাতে থাকেন। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আসছিলনা কিছুতেই। শিক্ষার্থীরা চাচ্ছিলেন এমন ভাবে যন্ত্রটাকে প্রস্তুত করতে যাতে যন্ত্রটা আইসোট্রপিক রেজাল্ট দেয়। তখন এর সমাধান খুঁজতে তারা কোয়ারটারনিয়ন নিয়ে পড়া শুরু করেন, Yaw, Pitch, Roll যেখানে X, Y, Z অক্ষের সাপেক্ষে গতিবিধি নির্দেশ করে। আর কোয়ারটারনিয়ন এর ধারণাটা আরও চমৎকার।গণিতের ভাষায়, ‘‘The quarternions are a number system that extends the complex numbers. Quarternions কে নিচের উপায়ে প্রকাশ করা যায় :
a + bi + cj + dk
a,b,c,d এখানে বাস্তব সংখ্যা এবং i, j,k হল fundamental coordinate units. এদের মধ্যে একটি সুন্দর সম্পর্ক আছে। এ সম্পর্কটি হল:

এটি একটি Hypersphere নির্দেশ করে যা একটি ত্রিমাত্রিক পৃষ্ঠের প্রতিনিধিত্ব করে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ত্রিমাত্রিক ঘূর্ণন সহজে নির্ভুলভাবে বোঝা যায়।

দলের সদস্যরা জানান, পুরো যন্ত্রটি তৈরি করতে তাদের খরচ হয়েছে মাত্র এক হাজার টাকার কাছাকাছি যা আরও অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব এবং চাইলে ডিটেক্টরের সংবেদনশীলতাও আরও কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব। যন্ত্রটি সাধারণ পেন্সিল ব্যাটারিচালিত তড়িৎ উৎসের মাধ্যমে খুব সহজেই ব্যবহারযোগ্য এবং চাইলে আকার ও খুব ছোট করে আনা সম্ভব। ভূমিকম্পের আগামবার্তা জেনে যদি তাদের উদ্ভাবিত উপায়ে একটি জীবনহানিও কমানো যায় তখনই তাদের পরিশ্রম সার্থক হবে বলে জানান সদস্যরা।

ভূমিকম্প হবার পর আমাদের যতখানি তৎপরতা থাকে অত্যধিক, যেটি পরবর্তী সময়ে অবহেলায় পর্যবসিত হয়। শিক্ষার্থীদের এই প্রজেক্টগুলোকে সহযোগিতা দেয়ার মাধ্যমে ভূমিকম্প সম্পর্কিত সচেতনতা এবং ক্ষয়ক্ষতি কমাতে এই দেশীয় প্রযুক্তি হতে পারে একটি অনবদ্য সমাধান।

Share Button

7 Comments

    • এভাবে ভূমিকম্প আসার ন্যুনতম ১৫-২০ সেকেন্ড আগে মানুষ নিজেদেরকে প্রস্তুত করার সময় পাবে। এরকম বিপদজনক সময়ে ১৫-২০ সেকেন্ডের সময় বাঁচিয়ে দিতে পারে হাজারো প্রাণ।

    • এইটা ভূমিকম্পের এপিসেন্টারের অবস্থান আর তীব্রতার উপর নির্ভর করে। জাপান ২০১১ তে ৮০ সেকেন্ড আগে প্রাইমারি ওয়েভ ডিটেক্ট করেছিল, দূরত্ব আর তীব্রতা যত বাড়বে তত বেশী টাইম ডিফারেন্স থাকবে প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি ওয়েভ এর মধ্যে।

  1. এভাবে ভূমিকম্প আসার ন্যুনতম ১৫-২০ সেকেন্ড আগে মানুষ নিজেদেরকে প্রস্তুত করার সময় পাবে। এরকম বিপদজনক সময়ে ১৫-২০ সেকেন্ডের সময় বাঁচিয়ে দিতে পারে হাজারো প্রাণ।

  2. Are you guys sure this device “predicts” and not “detects” earthquakes? BTW, our team here at DU made such a device (patent pending ;)) using part of an IMU (an accelerometer) for cut-off of utility lines. Our system doesn’t “predict” but it “detects” earthquakes and performs precautionary actions. If their system really does predict earthquakes, then this thing will win a Nobel Prize!
    Scientific Paper: https://www.researchgate.net/publication/310463920_Microcontroller_Based_Earthquake_Detection_System_for_Spontaneous_Cut-off_of_Domestic_Utility_Lines_for_Safety_Measures?ev=prf_pub
    Media links:
    1. https://www.youtube.com/watch?v=LaS4igfQfAU
    2. http://www.observerbd.com/details.php?id=48535
    3. http://campustimes.press/it-news/2016/12/06/%E0%A6%A2%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A6%BF-%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%A5%E0%A7%80%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%89%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%AD%E0%A6%BE
    4. http://www.dhakatimes24.com/2016/12/17/12427/%E0%A6%AD%E0%A7%82%E0%A6%AE%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AA-%E0%A6%B9%E0%A6%B2%E0%A7%87-%E0%A6%AC%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A7-%E0%A6%B9%E0%A6%AC%E0%A7%87-%E0%A6%97%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%B8-%E0%A6%93-%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A7%81%E0%A6%A4%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%A8

    There’s a fine line between both. 🙂 Good work btw.

  3. I made ”Earthquake Predictor” 2 years ago but didn’t exhibit it anywhere before 4 th February 2017. On 4 th February I displayed it on “Engenius 17” on hardware project show which was an inter university tech competition,arranged by AUST .I displayed a demo of my project for the mayanmar- tripura fault line .I showed that if the epicenter of earthquake is on that fault line or nearby area then what will be the time delay for all the divisions of our country .I showed approximate time delay.I made this project 2 years ago when I first got the idea of primary wave or pressure wave and secondary wave of earthquake. Recently when I decided to show this project on a hardware project show then I researched it more and got that this is used on California and Japan for earthquake early warning.

  4. দ্শের সাধারণ মানুষ এই যন্ত্র টি কোথায় পাবে?? জানতে পারলে আমরা সবাই খুব উপকৃত হব।

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*