আমাদের গল্প-স্বপ্নঃ NASA আয়োজিত বিশ্বের সবচেয়ে বড় হ্যাকাথন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশী শিক্ষার্থীরা!

যুক্তরাষ্টের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা আয়োজিত বিশ্বের সবচেয়ে বড় হ্যাকাথন প্রতিযোগিতা হচ্ছে– ‘নাসা স্পেস্ অ্যাপস চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের দল ‘Atto-Unmesh’ বিশ্বের ১৩৭টা দলকে পিছনে ফেলে এই মুহূর্তে রয়েছে ৪র্থ অবস্থানে। দলনেতা বুয়েটের শিক্ষার্থী আসিফ ইমরুল বুয়েটেকে লিখেছেন তাদের কথা।

নতুন টার্ম, নতুন টার্মব্রেক! স্বাভাবিকভাবেই নতুন কিছু শিখার হিড়িক উঠবেই প্রতিবারের মত। তাই এবারেও লেগে পড়লাম। পরীক্ষার ধকল আর চাপ কাটিয়ে উঠতে মেতে উঠলাম ওয়েব অ্যাপ বানানোর নেশায়। আগেই শেখা ছিল এইচটিএমএল-সিএসএস, এবার শিখলাম জাভাস্ক্রিপ্ট আর অল্পস্বল্প পাইথন। কোনও কাজে লাগবে আশা করিনি। কিন্তু হঠাৎ করেই আমাদের বুয়েট নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং ক্লাব এর বড়সড় একটা ইভেন্ট এর জন্যে গেইম বানানোর দায়িত্ব পড়ল আমার আর মারিয়ার উপর। শুরু করলাম বানানো, সে এক নেশার মত কাজ!

সারা দিন, সারা রাত খেটে খেটে গেইম বানানো আর বাগ সরানো, শুনতে একঘেয়েমি লাগলেও, বাস্তবে ততটাই মজার। লম্বা ছুটি গুলো পুরোটাই গিয়েছে এই কাজেই! প্রোগ্রামের ঠিক আগে আগে তৈরি হল Nuclear Ahead v.1. আর BUETIUM V.1 এর এই Nuclear Ahead v.1 । গেইম ইভেন্টে মানুষের বিশাল অংশগ্রহণে মুগ্ধ হলাম আমরা, তখন আসলেই মনে হল,খাটুনিটা সফল।

বেশিদিন বসে থাকতে হয়নি। এর মধ্যেই জানতে পারলাম NASA SPACE APPS CHALLENGE 2017 সম্পর্কে। একরাতে হুট করেই মাথায় আসলো Time-Plus এর আইডিয়াটা। কনসেপ্টটা এরকম যে, কার্ল নামের এক নভোচারী বিড়ালের নভোযান গ্রহাণুর আঘাতে ভেঙ্গে গেছে। সে আবার মস্ত-বড় ইনটেলিজেন্ট বিড়াল, ঠিকই নভোযানটা ঠিক করতে পারবে। কিন্তু গেমটি যে খেলছে তার কাজ একটাই – বিভিন্ন নক্ষত্র মণ্ডল ঘুরে মিশন খেলে কার্লকে পৌঁছে দিতে হবে সরঞ্জাম। এই জন্য রাতের পুরো আকাশের মত করে সাজানো হল গেইমের ভার্চুয়াল আকাশ। এক গৃহবন্দি মানুষও গেইমটা খেলার সময় অনুভব করতে পারবে আকাশের বিশালতা। সাথে দেওয়া হল নক্ষত্রগুলো নিয়ে ডিটেইলস তথ্য। আর মিশনগুলো সাজানো হল স্পেস হিস্ট্রির উপর ভিত্তি করে, যাতে করে এক গেইম খেলেই মানুষ একই সাথে জানতে পারে আকাশ নিয়ে আর আমাদের আকাশভ্রমণের গল্প নিয়ে। জমা দিয়ে দিলাম সে রাতে আমার বানানো ছোট্ট একটি গেইম Time-Plus ।

এর পর ভুলে গেছি সব কিছু। মিড-টার্ম ব্রেকের ঠিক আগের বুধবারেই মেইল পেলাম, ঢাকা বুট-ক্যাম্পে যাওয়ার আমন্ত্রণ। ততদিনে Time-Plus তৈরির দলে ডিজাইনার হিসেবে যোগ দিয়েছে মারিয়া। আমাদের দুইজনের টিম–ই গেলাম সেবারে। সত্যি বলতেই, আমরা যেই ছোট্ট গেইম দিয়েছিলাম, তার তুলনায় বাকিদের প্রশ্নোত্তর আর প্রোজেক্ট শুনে সেখানে ভালই ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম, না জানি কতকিছু!

যাই হোক, সেইদিন ফিরলাম এই ভেবে যে, যা করেছি তা-ই দেব, দরকার হলে নতুন আইডিয়ার সাথে মিলিয়ে করে নতুন কিছু বানাবো আমরা। এই বুট-ক্যাম্পেই প্রথম জানানো হল এবারের এপ্লিকেশনে নাসা আর্থ ডাটা ব্যবহার করতেই হবে। মারিয়ার মাথায় আসলো একটা ব্রিলিয়ান্ট প্লান। গেইমের সাথে সিকিউরিটি ফিচার যুক্ত করা। প্লানটা যে আগে বলে নি তা না। অনেক আগে থেকেই ওর ফিলসফি ছিল, একদিন মানুষের হাতের সব গেইমের সাথেই থাকবে কোনও না কোনও সিকিউরিটি ফিচার, যাতে করে বিপদে পড়লে এই গেইমই তার জীবন বাঁচাতে পারে।

আমরা একটি এপস্‌ বানিয়েছি যা আপনাকে মহাকাশ সম্পর্কে খেলার ছলে নানা তথ্য জানাবে, এবং পাশাপাশি নানা বিপদে আপদে আপনার কাজে আসবে। ধরুন আপনি ভূমিকম্পের ফলে কোন এক বিল্ডিং এ আটকা পড়লেন, আপনি এই এপস্‌ ব্যবহার করে আপনার নিখুঁত অবস্থান জানাতে পারবেন। কোথাও আগুন দেখলেন, এপস ব্যবহার করে আপনি সতর্কবাণী পাঠাতে পারবেন।

আগুন নেভানো রোবট!

এরপর আসা যাক আমাদের আরেক উদ্ভাবন নিয়ে! আমরা এই এপের পাশাপাশি একটি রোবট বানিয়ে ফেলেছি, যা আপনার স্মার্ট-ফোন দিয়ে কন্ট্রোল করা সম্ভব এবং যে রোবট আগুনের ভেতর গিয়ে পানি স্প্রে করে আগুন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে!

এমনি করেই Project জমার দিন সামনে আসতে লাগলো। ততদিনে এড হয়েছে প্রোজেক্টের নতুন দিক – “রোবো১৮০৪”, অনিমেষ সেটা নিয়ে ব্যস্ত হল, দীগার লেগে পড়ল এপের ভবিষ্যৎ নিয়ে জরিপ করতে । আর আমি আর মারিয়া গেইম আর বাকি জিনিসপত্র ঠিক করতে লাগলাম। সন্ধেবেলায় সিটি-কুইজ-সব ধকল কাটিয়ে সাবমিশনের জন্যে লেগে পড়লাম চারজন। ভিডিও (https://www.youtube.com/watch?v=TgbMRLzGIoo&t=4s) রেকর্ডিং করলাম দিগার আর মারিয়ার সাথে। রাত ১০ টায় হলে ফিরলাম। রেজিস্ট্রেশন সহ সবই বাকি তখনও। নেট কানেকশনে সমস্যা। কারও টা হয়, তো কারও টা হয়না! সে কি মুশকিল! ৪ মিনিটের ভিডিও জমা দিতে হবে, আবার গেইম ও তো জমা দিতে হবে, বাগ ঠিক করছি… হুলুস্থুল পড়ে গেল একদম!
এই করতে করতেই ১২ টা পার হয়ে গেল, সাবমিশন ১১:৫৯ পর্যন্ত। সব হতে হতে ১২:৩০ বাজল। ভাবলাম, শেষ, আউট আমরা। ডেডলাইন পার করে ফেলেছি। নিজের মনকে বুঝাতে থাকলাম, বাকিদের কেও সান্ত্বনা দিলাম। খেটেছি, অনেক কিছু শিখেছি। থাক, পরেরবার আবার হবে।

দুইদিন পর, সন্ধ্যেবেলা হুট করে মারিয়ার ফোন, “বেসিস এর পেইজটা দেখেছ? আমরা টপ ২০ টা টিমের মধ্যে আছি! হ্যাকাথনে যাচ্ছি আমরা!!!!” সেই মুহূর্তে যে কি লাগছিল, বলে বুঝানো কঠিন! পরে জেনেছিলাম সাবমিশনের রাতে বেসিস এর পেইজে ডেডলাইন পরেরদিন সকাল পর্যন্ত বাড়িয়েছিল, যা কিনা আমরা কাজের চাপে খেয়াল করতেই পারিনি! আলহামদুলিল্লাহ, অনেক খুশি হয়েছিলাম সেদিন চারজনেই।

২৯ এপ্রিল, শনিবার, সকাল ৫ টা। জীবনের প্রথম হ্যাকাথন ছিল আমাদের তিনজনেরই।

রেডি হলাম, কাপড়-চোপড় আর গেজেট নিতেই ব্যাগের অবস্থা বেহাল। নিচে নামলাম রোবটসহ। এরপর কোনমতে দিগার কে টেনে এনে উবার এ উঠলাম চারজন শুরু হল জার্নি টু হ্যাকাথন। পৌঁছলাম অনেকটা আগেই। তার ৪০ মিনিট পরে ডাক পড়ল সবার ব্যাগ নিতে। নিয়েই রুমে ঢুকে জানলাম উপরতলার প্রথম টেবিলটাই আমাদের। শুরু হল যুদ্ধ। মাল্টি-প্লাগে এক একজনের চার্জার লাগিয়ে, নেট কানেকশন খুঁজতে লাগলাম। কেবল একটাই ছিল। তাই রেজিস্ট্রেশনের সময়ে রীতিমত হুলুস্থুল পড়ে গেল। মেন্টররা জানালেন ৩০ সেকেন্ডের ভিডিও টা জমা দিতে হবে বিকেল ৬ টার মধ্যেই। অ্যাপ ডেভেলপ করব? নাকি এসব করব? নেট শুধু একটা ল্যাপটপেই। মারিয়ার টায় নেট সাপোর্ট নিচ্ছিল না। অনিমেষ আর দিগার রোবট এর কাজে ল্যাপটপ লাগাচ্ছিল। তখন আমি আর মারিয়া দেরী না করে শুরু করে দিলাম ৩০ সেকেন্ডের ভিডিও বানানো (https://www.youtube.com/watch?v=_hL2VbMNd5U)। শেষ ও হল আগেই, মিউজিক আড করে দেখলাম, বাহ! ভালোই তো লাগছে!!! এতক্ষণের ঝিমানি সব ভুলে গেলাম, কাজের গতি বেড়ে গেল ওটা জমা দেয়ার পরে। জানলাম ৯ টার মধ্যেই পরেরদিনের প্রেজেন্টেশন এর স্লাইড জমা দেয়া লাগবে। আবারো ঝড় উঠল টেবিলে, আমরা দুজন বানাতে লাগলাম স্লাইড। ৯টার আগেই জমা দিয়ে দিলাম।

বৃষ্টিস্নাত ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির মঞ্চ সব কষ্ট যেন ভুলিয়ে দিচ্ছিল। আর রাত জেগে সবার গান-বাজনা আমাদের জাগিয়ে রাখতে অনেকটাই সফল হয়ে গিয়েছিল! কিন্তু শেষ রাতে সবাই ঘুম!

পরেরদিন আসল। প্রেজেন্টেশন এর প্রস্তুতি নিলাম আমি ; মারিয়া ভুল ধরিয়ে দিচ্ছিল আমার। ১২.৩০ এর দিকে আমাদের প্রেজেন্টেশন হল। প্রাইজ গিভিং অনুষ্ঠানের সময়ে ঠিক মাথা আর কাজ করছিল না আমাদের কারও! ভাবছিলাম বাড়ি গিয়ে ঘুম দিব কখন। এরই মধ্যে শুরু হল একে একে প্রাইজ দেয়া, ঢাকা জোন থেকে পিপলস চয়েস অ্যাওয়ার্ড পেলাম আমরা, নিজেরা চিল্লানোর মত বুদ্ধি কাজ করছিল না তখনও, কিন্তু দেখলাম সবাই তালি বাজাচ্ছে, তখনকার অনুভূতি টাই অন্যরকম ছিল! অ্যাওয়ার্ড নিলাম, নিয়ে ফিরার সময় বুঝে উঠলাম, হ্যাঁ, আসলেই পেয়েছি, পেরেছি আমরা। এতদিনের কষ্ট সফল হয়েছে আসলেই। সৃষ্টিকর্তার কাছে অসীম ধন্যবাদ জানালাম। যখন বুঝে উঠলাম সবাই, তখন সব ক্লান্তি যেন উড়েই গেল আমাদের। ব্যাস, অনিমেষ আর দিগার বলে উঠল, “কোন কথা হবে না মামা, চল ৩০০ ফিট যাই… সেলিব্রেট করব”। দৌড় দিলাম চারজনই অনিমেষ এর গাড়ির দিকে!

গল্পের শেষ এখানেই নয়, এখন লড়ছি আমরা সবাই। বাংলাদেশের হয়ে এখন ১৪১ টা টিমের সাথে ভোট যুদ্ধে লড়ছে বাংলাদেশ। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ১৪১ টা প্রকল্পের মধ্যে ৫ম অবস্থানে ‘আত্ম-উন্মেষ’। ২২ মে পর্যন্ত ভোটাভুটি শেষে শীর্ষ ৫টা দল জায়গা করে নিবে ফাইনালে। তারপর শুরু হবে, ফাইনালের ভোটাভুটি। এবারের যুদ্ধে সবটাই কিন্তু মানুষের ভোটের উপরে, আমাদের টিমের করার কিছুই নেই। একজন যদি প্রতিদিনে ঠিক ঠিক একটি করে ভোট দিন, দেশের খাতায় যোগ হবে অনেকগুলো ভোট। গতবার নাসা স্পেস অ্যাপস চ্যালেঞ্জের এওয়ার্ডটা একটুর জন্য হাত ছাড়া হয়েছে। দেখা যাক, এবার কিসের পালা? পুরোটাই জনগণের উপর।

ভোট দেওয়ার পদ্ধতি: https://www.facebook.com/AttoUnmesh/photos/a.259250197877939.1073741828.259245531211739/261779680958324/

অথবা সরাসরি নিচের লিঙ্কে গিয়েও ভোট দেয়া যাবে।

https://2017.spaceappschallenge.org/vote?q=Atto-Unmesh

ইভেন্ট লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/events/1804701596524943/

লেখক:
মোঃ আসিফ ইমরুল
দলনেতা, আত্ম-উন্মেষ

Share Button

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*