পদ্মা সেতু-এক স্বপ্নপূরণের গল্প –৩

ফিজিবিলিটি পরীক্ষা হলো, ব্রীজও হওয়ার পথে। কিন্তু প্রোজেক্টে আরও অনেক কিছু রয়ে গেছে, যেমন নদীশাসনের কাজ, এপ্রোচ রোডের কাজ। এবার চলেন সেগুলোর দিকে তাকাই।

শুধু একটা ব্রিজ বানালেই কাজ শেষ হয়ে যায় না। সেই ব্রিজের সাথে যে রাস্তাগুলোতে এখন গাড়ি চলছে, সেই রাস্তার সাথে ব্রিজের সংযোগ দিতে হয়। এই সংযোগ দেয়া রাস্তাটাই এপ্রোচ রোড। পদ্মা ব্রিজের এই এপ্রোচ রোড হল ব্রিজের দ্বিগুণ লম্বা, ১২ কিমি! এই এপ্রোচ রোড তৈরির কাজটা করেছে দেশের এক কোম্পানি, আব্দুল মোনেম লিমিটেড।

এই এপ্রোচ রোডের কাজের মধ্যে ছিল জাজিরা থেকে জাতীয় সড়কের সঙ্গে সংযোগ। একইভাবে মাওয়ার কাছাকাছি যে রাস্তা ছিল সেটাকে আন্তর্জাতিক মানে আনা। আর সার্ভিস এরিয়া তৈরি, যেটা এই বিশাল কন্সট্রাকশন সাইটের মেইন অফিস। নির্মাণের সময় এবং নির্মাণ শেষ হয়ে গেলে এখানে অফিস এবং বাসস্থান নির্মাণ হবে। এর মধ্যে জাজিরা প্রান্তে যে সংযোগ সড়ক আছে, সেখানে পাঁচটা সেতু প্রয়োজন। শুধুমাত্র এই সেতুগুলোর দৈর্ঘ্য যোগ করলেই দাঁড়ায় প্রায় এক কিলোমিটার!

প্রকৌশলগত দিক থেকেও এ কাজটা কঠিন ছিল। জাজিরার রাস্তাটি একসময় চর এলাকা ছিল, মাটি নরম। এত নরম মাটির ওপর দিয়ে রাস্তা করা সমস্যা, কারণ এতে রাস্তা জায়গায় জায়গায় ডেবে যাবে এবং ফলাফল হিসেবে উপরে পিচের রাস্তা ভেঙে যাবে। তারপর যে কোন রাস্তা আবার বন্যার লেভেলের অনেক ওপরে রাখতে হয়। অর্থাৎ বন্যার রেকর্ড থেকে খুঁজে বের করা হবে সবচেয়ে বেশি কতখানি পানি উঠেছিল। তারপর দেখা হবে, একটা নির্দিষ্ট সময়ে (হয়ত আগামি ১০০ বছরে) বন্যায় সর্বোচ্চ কতটুকু পানি উঠতে পারে। তারপর সেই সর্বোচ্চ উচ্চতার পানির উপরে যেন রাস্তা থাকে, সেভাবে রাস্তা বানানো হবে।

এজন্য মাটি ফেলে বাঁধের মত উঁচু জায়গা বানানো হয়েছে। এরপর রাস্তার নিচের মাটির ঘনত্বটা বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এ কাজের জন্য মেশিন আনতে হয়েছে জার্মানি থেকে। নাম হলো স্যান্ড কমপ্যাকশন পাইল। মাটির ঘনত্ব বাড়ানো হয়েছে। এতে আশা করা যায়, যখন কোনো যানবাহন চলাচল করবে, তখন এই রাস্তা ডেবে যাবে না। বহু পরীক্ষা করা হয়েছে। গাড়িও চলছে, কোনো ধরনের সমস্যা হচ্ছে না। এই এপ্রোচ রোডের কাজ এখন শেষ বললেই চলে।

পদ্মা ব্রিজ বানানোর জন্য দুই বিশাল কন্সট্রাকশন ইয়ার্ড বানানো হয়েছে মাওয়া আর জাজিরা, দুই প্রান্তে। এই বিশাল কন্সট্রাকশন ইয়ার্ড আর এপ্রোচ রোডের জন্য, বিশাল পরিমাণ জমি অধিগ্রহণ করতে হয়েছে। ১৩ হাজার বাড়ি যেখানে প্রায় ৭৪ হাজার মানুষ বসবাস করত, এই প্রোজেক্টের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব মানুষদের জন্য সাতটা রিসেটেলমেন্ট এরিয়া বরাদ্দ দেয়া হয়েছে নদীর দুই ধারে। সেখানে তাদের ঘরবাড়ি, মসজিদ, স্কুল, বাজার এগুলো সবই বানিয়ে দেয়া হয়েছে।

পদ্মা নদীর আশেপাশের অনেক গাছ কাটা পড়েছে এই কন্সট্রাকশন ইয়ার্ড, এপ্রোচ রোড, রিসেটেলমেন্ট এরিয়া আর সার্ভিস এরিয়ার জন্য। এজন্য বনায়নও করা হয়েছে। ডিসেম্বর ২০১৫ পর্যন্ত ৭০,৪৫২ টি গাছ লাগানো হয়েছিল। এই দায়িত্ব ছিল বনবিভাগ এর।

ইলিশ মাছের প্রজনন এর সময়, তাদের স্বাভাবিক পরিবেশের যাতে ব্যাঘাত না ঘটে, তাই পাইলিং এর কাজ বন্ধ ছিল! এত সুন্দর প্রোজেক্ট আগে কখনও এখানে হয় নি, যেখানে প্রকৃতির সাথে সমঝোতা করার এত আন্তরিক চেষ্টা করা হয়েছে।

পদ্মা ব্রিজের আর একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল নদীশাসনের কাজ। চলুন প্রথমে দেখি, নদীশাসনটা আসলে কী, কেন দরকার।

নদী ভাঙে গড়ে। নদী তার গতিপথ পরিবর্তন করে। এখন ব্রিজটা থাকলো মাওয়া জাজিরায়, নদী হয়ত গতিপথ পাল্টায়ে অন্য কোথাও চলে গেল। তো পদ্মা ব্রিজের দুইপাশে যাতে কিনার থাকে, আর সেই কিনারে যাতে এপ্রোচ রোড থাকে; যাতে গাড়ি ব্রিজ থেকে নেমে চলার রাস্তা পায়, এজন্যই নদীশাসনের কাজটা করা হচ্ছে।

নদীশাসন বলতে বোঝায়, নদীর গতিপথ ও কিনারা রক্ষার জন্য যে স্ট্রাকচারাল কাজ করা হয়। মানে কিনারা বাঁচানোর জন্য যখন ইট পাথর বা এই জাতীয় জিনিস ব্যবহার করা হয় বা যেকোনো কিছু ব্যবহার করা হয়।

বিভিন্ন বছরের বন্যার সময়ের ডাটা এনালাইসিস করে এটা বের করা হয় যে, আগামী ১০০ বছরের প্রতি সেকেন্ডে এক লাখ ৪০ হাজার ঘনমিটার পানি সাগরে যেতে পারে পদ্মা দিয়ে (মানে এই যে পদ্মার পানি প্রবাহ, এর ২০ সেকেন্ডের পানি যদি আটকানো যেত, তাহলে বৃহত্তর ঢাকা শহরের এক কোটি ৬০ লাখ লোকের এক দিনের খাওয়ার পানি হতো!)। এই যে এত পানি পার হয়ে সাগরে যায় পদ্মা দিয়ে, এটা পৃথিবীর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ! প্রথম আমাজান। পদ্মা হলো দুই নম্বর। এই পানিটা নিতে হবে ব্রিজের নিচ দিয়ে। সেই ব্যবস্থা রাখতে হবে যেন পানি সেতুর নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে যেতে পারে। এই পানি কোনভাবে যদি আটকা পড়ে একইসাথে বন্যা হবে আপস্ট্রিমে (নদীর পশ্চিম-উত্তর দিকে) এবং একই সাথে এই পানি ব্রিজের উপর অনেক বেশি প্রেশার দিবে বা ধাক্কা দিবে। ফলাফল হিসেবে ব্রিজ ফেইল করা খুব স্বাভাবিক হবে।

এগুলো হলো নদীশাসনের চ্যালেঞ্জ। পৃথিবীর খুব কম ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আছে, যারা এ কাজটি করতে পারে। পদ্মা ব্রিজের নদীশাসনের কাজের জন্য যখন টেন্ডার চাওয়া হয়, তখন মাত্র ৩টা কোম্পানি টেন্ডার জমা দেয়। 1. Hyundai Engineering and Construction Ltd. of South Korea, 2. Jan De Nul N.V. of Belgium, 3. Sinohydro Corporation Ltd. of China

২০১৪ সালের জুলাইতে এই টেন্ডার পায় সিনোহাইড্রো।

এই কাজের মধ্যে চলছে নদী ড্রেজিং করা। ড্রেজিং করা মানে হল, তলদেশের কাদামাটি তুলে এনে অন্য কোথাও সরিয়ে ফেলা। যাতে পানির গতিপথে বাধা কম থাকে। যাতে বেশি পরিমাণ (বেশি ভলিউম এর) পানি যেতে পারে। এতে কিনারে পানির ধাক্কা কিছুটা কমবে বলে আশা করা যায়। মাওয়া প্রান্তে ড্রেজিং করা হবে ১০ মিলিয়ন কিউবিক মিটার। আর জাজিরা প্রান্তে ড্রেজিং করা হবে ৪০ মিলিয়ন কিউবিক মিটার।

এই নদীতে ড্রেজিং করতে হচ্ছে ১০০ ফুটের বেশি। পানির নিচে। আগেই হিসাব করা হয়েছে, নদীর পাড় পানির নিচে কেমন ঢালু হবে। সে অনুসারে নদীর পাড়ের মাটি কাটতে হবে। সে জন্য স্পেশাল ড্রেজার ব্যবহার করতে হয়। যেটা জিপিএস কন্ট্রোলড, পানির নিচের মাটি নিজেই হিসাব করে কাটতে কাটতে যাবে।

নদীশাসনের আর একটা অংশ হিসেবে চলছে নদীর কিনারার দিকে পাথর, কংক্রিট ব্লক আর জিও ব্যাগ ফেলা। মাওয়া প্রান্তে পাথর প্রয়োজন ৮.৫ লাখ টন আর জাজিরা প্রান্তে পাথর ফেলা হবে ৩০ লাখ টন। ৮০০ কেজি ওজনের জিও ব্যাগ ফেলা হবে ৩,৯০৭,৫০০ টি। ১২৫ কেজি ওজনের জিও ব্যাগ ফেলা হবে ১৭,২৬৭,৫০০ টি। টোটাল CC Block (সিমেন্ট কংক্রিট ব্লক) এর সংখ্যা ১৩,৩০১,২৪৮।

মাওয়া প্রান্তে নদীশাসনের কাজ হবে ১.৬ কিমি জুড়ে। আর জাজিরা প্রান্তে ১২.৪ কিমি। জাজিরা প্রান্তে এত বেশি কাজ হওয়ার কারণটা বাংলাদেশের ম্যাপ দেখলেই বোঝা যায়। কারণটা হল, পানিটা উত্তর পশ্চিম থেকে ভীষণ বেগে এসে বেশি ধাক্কা দেয় জাজিরা সাইডকে। এখানে ধাক্কা খেয়েই পানিটা দক্ষিণ-পূর্বে যায়।

আবার মাওয়া সাইটে মাটির ধরন কিছুটা ক্লে বা এঁটেল মাটি। দক্ষিণ দিকে জাজিরার সাইটে ক্লে নেই। সেখানে পলি, বালু এবং বেলে-দোআঁশ মাটি। স্রোত বেশি এলে এটা ক্ষয় হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তাই এই নদীশাসন করা হয়েছে জাজিরার সাইটে সাড়ে ১০ কিলোমিটারের মতো। আর মাওয়া সাইটে মাত্র দেড় কিলোমিটার। ২০১৬ সালে মাওয়া সাইটে অপ্রত্যাশিতভাবে হঠাৎ ভাঙন দেখা যায়। তখন আরো কিছু বেশি কাজ করা হয়।

নদীশাসন ব্যাপারটি খুবই দুরূহ। কারণ নদীতে scour (মাটি ধুয়ে যাওয়া) এত গভীরে যেতে পারে যে হয়তো ওপরের দিকে কিছু প্রটেকশন দেয়া হল, দেখা গেল নিচ থেকে মাটি ধুয়ে চলে গেছে। তখন উপর থেকে পাড় ভেঙে পড়ে যাবে। কারণ নিচে কোন সাপোর্ট নেই, সাপোর্টের মাটি ধুয়ে চলে গেছে পুরোটাই। এজন্য অনেক নিচে থেকে পাথর, কংক্রিট ব্লক আর কিছুটা নতুন প্রযুক্তির জিও টেক্সটাইল ব্যাগ ব্যবহার করা হয়েছে।

নদীশাসন সব সময়ের জন্যই চালিয়ে যেতে হবে। নাহলে এই ব্রিজ টেকানো কঠিন। প্রতিটা স্ট্রাকচারের টেক কেয়ার করতে হয়। নতুবা টেকে না। বাংলাদেশের জন্য পদ্মা সেতু গরীবের হাতি পোষার মতই ব্যয়বহুল। কিন্তু এই হাতিকেই যথাযথভাবে কাজে লাগালে তা দেশের অর্থনীতিকে টেনে নিয়ে যাবে বহুদূর!

 

তথ্যসূত্র : ১. http://www.kalerkantho.com/print-edition/Construction/2017/04/08/484152

২. http://www.bssnews.net/newsDetails.php?cat=0&id=418119&date=2014-06-19

৩. http://www.structuremag.org/?p=524

৪. Design, construction and maintenance of bridges in Bangladesh: In the past, present and future A.F.M.S. Amin Bangladesh University of Engineering and Technology, Dhaka 1000, Bangladesh Y. Okui Saitama University, Saitama 338-0825, Japan

Author: শ্রাবস্তী রোম্মান
Contributor: মোনায়েম হাসান

 

Share Button

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*